বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৩ এএম
আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৪৭ পিএম
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার শৌলা গ্রামে ‘ঘসেটি বেগমের কুঠিবাড়ি’ অযত্ন-অবহেলায় খসে পড়ছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের শৌলা গ্রামে অবস্থিত নবাবী আমলের অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন ‘ঘসেটি বেগমের কুঠিবাড়ি’। উপজেলা শহর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে এটি অবস্থিত। প্রায় ২৮০ বছর পূর্বে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার নবাব আলীবর্দী খানের মেয়ে ঘসেটি বেগম এটি নির্মাণ করেন। তার অনুসারে ‘ঘসেটি বেগমের কুঠিবাড়ি’ হিসেবেই বাড়িটি পরিচিত লাভ করেন। নবাবী আমলের পরে এখানে অনেকে নামাজ আদায় করতেন। যে কারণে এ বাড়িটি ‘ঘসেটি বেগমের মসজিদ’ নামেও লোকমুখে শোনা যায়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এ প্রাচীন স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
কুঠিবাড়িটি চারকোণে নির্মাণ করা হয়েছে। চারপাশেই রয়েছে তিনটি করে জানালা। ভেতরে রয়েছে ছোট কামরা। দ্বিতীয় তলায়ও রয়েছে একটি কামরা। তার ওপরে রয়েছে গম্বুজ, যার চারপাশে চারটি পিলার। এটি নির্মাণ করা হয় লাল মাটি পুড়িয়ে বিশেষভাবে তৈরি করা ছোট ছোট ইট দিয়ে। পুরো কুঠিবাড়ি জুড়ে প্রাচীন সভ্যতার ছাপ রয়েছে। এটির নির্মাণকাল নির্দেশক কোনো শিলালিপি নেই। তাই এর স্থাপনাকাল নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এর স্থাপত্যশৈলী ও বিভিন্ন দিক বিবেচনায় ধারণা করা হয়Ñ প্রায় ২৮০ বছর আগে কুঠিবাড়িটি নির্মাণ করা হয়।
জানা গেছে, ১২০০ সালের দিকে বরিশাল অঞ্চলটি ছিল চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য। চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের রাজধানী ছিল কচুয়া। সেটি ছিল বর্তমান বাউফল অঞ্চলে। ১৭০০ সালের দিকে মোগল সাম্রাজ্যের প্রসার ও বাংলায় মোগল শাসনের প্রভাব বৃদ্ধির ফলে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য ধীরে ধীরে স্বাধীনতা হারায়। ১৭১৭ সালের দিকে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য সম্পূর্ণভাবে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৭৪০ সালে বাংলার নবাব হন আলীবর্দী খান। তার মেয়ে ঘসেটি বেগম কচুয়ায় ঘুরতে আসেন। তখন তিনি কিছুদিন থাকার জন্য তেঁতুলিয়া নদীর পাড়ে শৌলাগ্রামে এ কুঠিবাড়ি নির্মাণ করেন। এ এলাকায় কোনো মসজিদ না থাকায় এ বাড়িতে স্থানীয়রা নামাজ আদায় করতেন। যে কারণে অনেকে ঘসেটি বেগমের মসজিদ নামেও পরিচিত লাভ করে। দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এ প্রাচীন স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
নান্দনিক স্থাপিত্যশৈলীতে নির্মিত প্রাচীন এ কুঠিবাড়িটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা দেখতে আসেন। এ পুরার্কীতি সংরক্ষণ ও গবেষণা করে ইহিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরার দাবি জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিম তালুকদার বলেন, এটির সঠিক ইতিহাস কোথাও সংরক্ষিত নেই। আমাদের বাপ-দাদার মুখ থেকে শুনে আসেছি ঘসেটি বেগম এ অঞ্চলে ঘুরতে এসে এটি নির্মাণ করেছিলেন। তিনি কিছুদিন এখানে ছিলেনও। নবাবী আমলের আবসানের পর ব্রিটিশ আমলে এ বাড়িটিতে স্থানীয়রা নামাজ আদায় করতেন। এটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এটি সংরক্ষণে সরকারের কাছে দাবি তোলেন তিনি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আলতাফ হোসেন তুহিন বলেন, প্রাচীন এ কুঠিবাড়িটি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন নবাবী আমলের ঐতিহ্য ও ইতিহাস। বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আগামী প্রজন্মের জন্য সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উচিত ঘসেটি বেগমের কুঠিবাড়িটি সংরক্ষণ করা।