লোকালয়ে অভয়ারণ্য
ঝিনাইদহ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৮ এএম
আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:২৭ পিএম
মুখে শুধু ‘আয়’ বলা মাত্রই ছুটে আসে শত শত কালোমুখো হনুমান। এমনই এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা যায় ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ভবনগর গ্রামে। গ্রামজুড়ে চোখে পড়ে বিরল প্রজাতির এই হনুমানের অবাধ বিচরণ; কেউ গাছে, কেউ বাড়ির ছাদে, কেউ আবার মানুষের পাশে বসে নির্ভারভাবে সময় কাটাচ্ছে।
একসময় এলাকায় প্রচুর ফলদ ও বনজ গাছ থাকায় খাবারের অভাব ছিল না এই বন্যপ্রাণীর। কিন্তু গাছপালা কমে যাওয়া, বাগান উজাড় হওয়া ও মানব কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির ফলে এখন খাবার সংকটে পড়েছে তারা। ফলে কখনও ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে, আবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে অনেক হনুমান।
স্থানীয় যুবক নাজমুল হোসেন নিজ উদ্যোগে প্রতিদিন সরকারি বরাদ্দকৃত খাবার তাদের সামনে পৌঁছে দেন। তবে বরাদ্দকৃত খাবার অত্যন্ত অপ্রতুল। এতে একবেলাও ঠিকভাবে খাওয়ানো যায় না শতাধিক হনুমানকে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ডাক দিলেই এভাবে ছুটে আসে। ওরা এখন আমাদের পরিবারের মতোই কাছের। কিন্তু খাবারের সংকটে ওরা কষ্ট পাচ্ছে, এটাই সবচেয়ে কষ্টের।’
এদিকে প্রতিদিনই নানা জেলা থেকে আসে দর্শনার্থীরা। শিশু থেকে বড় সবাই মুগ্ধ হনুমানদের কাছাকাছি দেখতে পেয়ে। তবে খাবারের অভাব আর অরক্ষিত পরিবেশের কারণে কখনও কখনও হনুমান আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
দর্শনার্থী বসির আহমেদ বলেন, ‘এত কাছ থেকে এতগুলো হনুমান দেখা এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।’ স্থানীয় সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘সরকারি উদ্যোগ আরও বাড়ানো দরকার। তা না হলে একসময় হয়তো আর পাওয়া যাবে না এই হনুমানদের।’
এ বিষয়ে প্রাণ পরিবেশ প্রতিবেশ সংগঠক সুজন বিপ্লব বলেন, ‘কালোমুখো হনুমান রক্ষায় তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ, শিকারি প্রাণীর হাত থেকে সুরক্ষা এবং স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সরকার ও বন বিভাগকে তাদের জন্য অভয়ারণ্য ঘোষণা এবং খাবারের বরাদ্দ বাড়াতে হবে, যাতে তারা খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে না আসে এবং মানুষের সাথে সংঘাত এড়ানো যায়। যেসব অঞ্চলে কালোমুখো হনুমানের বিচরণ বেশি, সেগুলোকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা। তাদের বিচরণ ক্ষেত্র বা বনভূমি ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকা।’
ঝিনাইদহ জেলা ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, ‘নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিদিন বন বিভাগের পক্ষ থেকে বাদাম, কলা ও সবজি খেতে দেওয়া হয়, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। হনুমানগুলো মাঝেমধ্যে খাবারের অভাবে এদিক সেদিক ছুটে যায়। তবে এ জেলায় সামাজিক বনায়ন ছাড়া কোনো বন নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেউ হনুমান শিকার করলে বা ক্ষতির চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জেলায় বন না থাকায় হনুমানের অভয়ারণ্য ঘোষণা করার কোনো সুযোগ নেই।’
বন বিভাগের হিসাবে বর্তমানে ভবনগর গ্রামে রয়েছে দুই শতাধিক কালোমুখো হনুমান। অথচ একসময় ছিল দ্বিগুণেরও বেশি। প্রাকৃতিক আবাস ধ্বংস, খাবার সংকট আর মানবসৃষ্ট বৈরী পরিবেশে প্রাণীর সংখ্যা দ্রুত কমছে।
পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে এই বিরল প্রজাতির হনুমান, ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যও। তাই সবার আগে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত সংরক্ষণ উদ্যোগ, খাবারের স্থায়ী ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা।