× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তেল চুরি

সিস্টেমে গলদ নাকি শর্ষেতেই ভূত!

হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৩ এএম

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৯ এএম

সিস্টেমে গলদ নাকি শর্ষেতেই ভূত!

জ্বালানি তেল পরিবহনে স্থাপিত ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাইপ ফুটো করে তেল চুরি রোধ করা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার হাদির ফকিরহাট এলাকায় পাইপলাইনের ওপর টিনশেড ঘর নির্মাণ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন থেকে তেল চুরির ঘটনা ঘটেছে।

পাইপলাইনের কাছাকাছি অননুমোদিত খনন, চুরি বা নাশকতা শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয়েছিল পাইপলাইন ইনট্রুশন ডিটেকশন সিস্টেম (পিআইডিএস)। এর বাইরে পাইপলাইন পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থাপন করা সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেটা ইকুইজিশন (স্ক্যাডা) সিস্টেমে ইনস্টল ছিল পাইপলাইন লিক ডিটেকশন সিস্টেম (এলডিএস)। পাইপলাইনের কোথাও সমস্যা তৈরি হলে স্ক্যাডা সিস্টেমের তথ্য বিশ্লেষণ করে সিগন্যাল পাঠানোর কথা ছিল এই এলডিএস সিস্টেমের। প্রযুক্তিগত সিস্টেমের বাইরে প্রতি ৫ কিলোমিটার পরপর ছিল প্যাট্রলম্যান। যাদের দায়িত্ব সার্বক্ষণিক পাইপলাইন পরিদর্শন করে পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। 

ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইনের নিরাপত্তায় এতসব ব্যবস্থা নেওয়ার পরও পাইপ ফুটো করে কীভাবে তেল চুরি করা সম্ভব বড় হয়ে উঠেছে সে প্রশ্নটিই। তবে কি পাইপলাইনের নিরাপত্তায় নেওয়া এসব পদক্ষেপ কাজে আসেনি। বাস্তবেই কি সিস্টেমে গলদ ছিল নাকি শর্ষের ভেতরেই ভূত! পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি পিএলসির (পিটিসিপিএলসি) কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই এই কাজ হয়েছে, উঠছে এমন কথাও? পিটিসিপিএলসির কর্মকর্তাদের দাবি, পিআইডিএস সিস্টেমে গলদ ছিল। সিস্টেমটি পুরোপুরি টিউনিং না হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে সংকেত পাওয়া যায়নি। তবে ভিন্ন কথা বলছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, পিটিসিপিএলসির কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই এই তেল চুরির ঘটনা ঘটেছে। অন্যথায় এসব অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং প্যাট্রলম্যানের চোখ ফাঁকি দিয়ে এটি করা সম্ভব ছিল না। কর্মকর্তারা জড়িত থাকার কারণে হয়তো সংকেত আসার পর তারা সেটি এড়িয়ে গেছেন। 

রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। বিপুল পরিমাণ এই জ্বালানি তেল সড়ক ও সমুদ্রপথের পরিবর্তে পাইপলাইনে পরিবহনের জন্য ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর গত বছরের ১৬ আগস্ট প্রকল্পটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গার গুপ্তখাল থেকে ঢাকার ফতুল্লা পর্যন্ত পাইপলাইনে তেল পরিবহন শুরু হয়। তেল পরিবহনে যাতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে সেজন্য পাইপলাইনের কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে যাতে কেন্দ্রীয়ভাবে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে মনিটরিং করা যায় সেজন্য ব্যবহার করা হয় সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেটা ইকুইজিশন (স্ক্যাডা) সিস্টেম। এর বাইরে পাইপলাইনের কাছাকাছি অননুমোদিত খনন, চুরি বা নাশকতা শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয় পাইপলাইন ইনট্রুশন ডিটেকশন সিস্টেম (পিআইডিএস)। 

স্ক্যাডা সিস্টেম হলো একটি হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার সমন্বিত সিস্টেম, যা পাইপলাইনের প্রক্রিয়াগুলোকে রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে। এটি সেন্সর থেকে ডেটা সংগ্রহ করে (যেমন তাপমাত্রা, চাপ) এবং হিউম্যান মেশিন ইন্টারফেস (HMI)-এর মাধ্যমে অপারেটরকে দেখায়। এই সিস্টেমে পাইপলাইন লিক ডিটেকশন সিস্টেম (এলডিএস) অন্তর্ভুক্ত আছে, যা পাইপলাইনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তরল বা গ্যাস লিকেজ বা চুরির ঘটনা শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে অপারেটরকে সতর্ক করে দিতে পারে। অন্যদিকে পাইপলাইন ইনট্রুশন ডিটেকশন সিস্টেম (পিআইডিএস) হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে দীর্ঘ এই পাইপলাইনের সঙ্গে সেন্সরযুক্ত একটি কেবল সংযুক্ত করা হয়েছে। এই সিস্টেমে পাইপলাইনের আশপাশে খনন, কোথাও চাপের পরিবর্তন, ফাটল বা ছিদ্র হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত পৌঁছে দেবে নিয়ন্ত্রণকক্ষে। কিন্তু মিরসরাই এলাকায় পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির ঘটনায় দুটো সিস্টেম পুরোপুরি কাজ করেনি। স্ক্যাডা এবং পিআইডিএস সিস্টেম চালু থাকার পরও মিরসরাই উপজেলার হাদির ফকিরহাট এলাকায় পাইপলাইনের ওপর টিনশেড ঘর নির্মাণ করে তেল চুরির ঘটনা ঘটে। 

স্থানীয়রা জানান, পাইপলাইনের ঠিক ওপরেই একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আবছার। এক মাস আগে তার কাছ থেকে ঘরটি ভাড়া নেন খুলনা সিটি করপোরেশনের সোনাডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা নাসির উদ্দিনের ছেলে আমিরুল ইসলাম। অভিযোগ উঠেছে, ঘর ভাড়া নিয়ে আমিরুল ইসলাম সেখানে মাটি খুঁড়ে পাইপলাইন ছিদ্র করে তেল চুরি করে আসছিলেন। গত ৮ জানুয়ারি বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মিরসরাই থানা পুলিশ ওই দিন রাতে নুরুল আবছারকে গ্রেপ্তার করে। 

মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদা ইয়াসমিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা ওই দিন রাতেই পাইপলাইনের ওপর ঘর নির্মাণকারী নুরুল আবছারকে গ্রেপ্তার করি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আমাদের কাছে স্বীকার করেছেন, ঘরটি ভাড়া নেওয়া আমিরুল ইসলাম মাটি খুঁড়ে পাইপলাইন ফুটো করার বিষয়টি তিনি জানতেন। পাইপলাইন ফুটো করে ড্রামে ভরে তেল নিয়ে যেতেও কয়েকবার দেখেছেন।’ 

ভাড়া নিয়ে সেখানে মাটি খুঁড়ে তেল চুরি করা হলেও পাইপলাইনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত প্যাট্রলম্যানের নজরে না আসায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পিটিসিপিএলসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে পাইপলাইনের নিরাপত্তায় প্রযুক্তিগত সিস্টেমের বাইরে প্রতি ৫ কিলোমিটারের জন্য একজন করে প্যাট্রলম্যান রয়েছেন। তারা প্রতিদিন নির্ধারিত অংশ পরিদর্শন করেন। কিন্তু এক মাস আগে পাইপলাইনের ওপর ঘর নির্মাণ করা হলেও কেন সেটি খতিয়ে দেখা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, এই তেল চুরির সঙ্গে কর্মকর্তারা জড়িত। তাই পাইপলাইনের ওপর ঘর নির্মাণ করে তেল চুরি করা হলেও তারা সেটি এড়িয়ে গেছেন। 

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে পিটিসিপিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রায়হান আহম্মেদের বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তার দাবি, চোরচক্র পাইপ ফুটো করে তেল চুরি করতে পারেনি। পাইপ ফুটো করার সঙ্গে সঙ্গেই তেল উপচে পড়ার পর তারা পালিয়ে গেছে।

পাইপলাইনের নিরাপত্তায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার পরও কেন তেল চুরি রোধ করা যায়নি এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক আমিনুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পিআইডিএস এবং এলডিএস সিস্টেমের পুরোপুরি ফাইন টিউনিং এখনও হয়নি। এই সিস্টেমের পুর্ণাঙ্গ সুফল পেতে আরও এক বছর সময় লাগবে। সিস্টেমগুলো এখন কাজ করছে না এমন নয়, কাজ করছে, তবে শতভাগ রেসপন্স পাওয়া এখনও সম্ভব হচ্ছে না।’ প্রতি ৫ কিলোমিটার তদারকির জন্য একজন নিয়োজিত আছেন, এরপরও ঘর নির্মাণের বিষয়টি কেন নজরে এলো না। তার ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। তদন্তে সব বিষয় উঠে আসবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা