কুড়িগ্রাম প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:২৩ পিএম
আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:২৫ পিএম
মাত্র ৫০ শতাংশ কাজ শেষ করে সাইট অফিস না থাকলেও সাইট অফিসের নামে প্রকল্পের টাকা হরিলুট করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাইট অফিস নির্মাণ না করে বিল উত্তোলন করলেও এলজিইডি কর্তৃপক্ষ নির্বিকার ও নীরব দর্শকে ভূমিকা পালন করছে। অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ঠিকাদারকে দু’হাত উজার করে বিল পরিশোধ করে দিয়েছে কুড়িগ্রাম সদর এলজিইডি কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি আর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের ৩০ জুনের মধ্যে। প্রকল্পের নথি অনুসন্ধান করে বেরিয়ে এসেছে সরকারি প্রকল্পের টাকা হরিলুটের এই ভয়াবহ চিত্রটি। এ ব্যাপারে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরএবিআরসিবিসি এইচটি জেভি-এর বিরুদ্ধে একের পর এক।
জানা গেছে, কুড়িগ্রাম
সদর উপজেলা এলজিইডির তত্ত্বাবধানে নির্মাণাধীন কুড়িগ্রাম হরিকেশ মোড় আরএইচভি থেকে কাঁঠালবাড়ী
জিসি ভায়া হলোখানা ইউসিপি সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ৪৬ লাখ ১৪ হাজার ৯৬৯
টাকা। ৯ দশমিক ৮০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সড়কে প্রতি কিলোমিটারের ব্যয় প্রায় ১ কোটি
৫৭ লাখ টাকা। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি। প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি
উপজেলা ইঞ্জিনিয়ারকে ম্যানেজ করে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকার বিল।
প্রকল্প নথি অনুযায়ী, ঠিকাদারকে শুধু নিজের ব্যবহারের
জন্য নয়, ইঞ্জিনিয়ার-ইন-চার্জ ও তার স্টাফদের জন্য আলাদা করে সুসজ্জিত সাইট অফিস নির্মাণ
করতে হবে। সেখানে থাকতে হবে টাইলস ফ্লোর, শক্ত ফাউন্ডেশন, ইটের দেয়াল, জিপসাম বোর্ডের
ফলস সিলিং, কাচ লাগানো জানালা, স্টিল গ্রিল, উন্নত মানের রং- সব মিলিয়ে যা একটি স্থায়ী ভবনেরই বৈশিষ্ট্য
বহন করে।
এখানেই শেষ নয়। অফিসে বিদ্যুৎ, পানি, ওয়াশরুম, স্যুয়ারেজ
ব্যবস্থা, অনুমোদিত লক, নিরাপত্তা রক্ষী, দিন-রাত গার্ড ও অ্যাটেনডেন্ট রাখার কথাও
বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, অফিসের জন্য আলাদা এক্সেস রোড,
হার্ড স্ট্যান্ডিং, বৈদ্যুতিক ও পানির লে-আউট, এমনকি ছাউনি পর্যন্ত করতে হবে। এসব পরিকল্পনা
আগে থেকেই ইঞ্জিনিয়ার-ইন-চার্জের অনুমোদন নিতে হবে। অর্থাৎ, প্রতিটি ধাপে ব্যয়ের সুযোগ
রেখে দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে অফিসের ভেতরের সরঞ্জাম
তালিকায়। নথি অনুযায়ী, একটি তথাকথিত অস্থায়ী অফিসে থাকতে হবে অফিস ফার্নিচার, এয়ার
কুলার, পানিশোধক, ক্রোকারিজ, কম্পিউটার ও মনিটর, ইউপিএস, লেজার প্রিন্টার, এলইডি ফ্লাড
লাইট ও হ্যালোজেন সিকিউরিটি লাইটÑ আরও বিস্ময়কর হলো, ঠিকাদার মাত্র ২৮ দিনের মধ্যে
এই পুরো অফিস ‘ইঞ্জিনিয়ার-ইন-চার্জের বসবাস ও ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত’ করতে বাধ্য।
নথিতে স্পষ্ট বলা আছে এই অফিস গ্রহণযোগ্য না হলে কোনো অন্তবর্তী বিল ছাড় করা হবে না।
সরজমিনে এই কাজের কোনো সাইট অফিসের একটি টিনের ঘরও নেও।
খোলা আকাশের নিচে কাজ চলছে। অথচ সাইট অফিসের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ৪ লাখ ৮৭
হাজার ১৩০ টাকা।
অপরদিকে, সরকারি উন্নয়ন কাজের আড়ালে এবার আলোচনায় এসেছে
টেলিফোন ও বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণের কাজ। সাধারণ চোখে যা একটি রুটিন কাজ বলে মনে হওয়ার
কথা, প্রকল্প নথি ঘেঁটে বেরিয়ে এসেছে ব্যয় বাড়ানোর সুস্পষ্ট ফাঁকফোকর।
নথি অনুযায়ী, খুঁটি অপসারণের নামে শুধু খুঁটি তোলাই নয়- এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে মাটি খনন, ফাউন্ডেশনের
কংক্রিট ভাঙা, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন লাইনের বিচ্ছিন্নকরণ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তত্ত্বাবধান।
যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। বাস্তবে বৈদ্যুতিক খুঁটি সড়কের অভ্যন্তরেই
রয়েছে। আর ঠিকাদার অফিসকে নির্দিষ্ট কমিশন দিয়ে বাগিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের বিল।
এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট আরএবিআরসিবিসি এইচটি জেভি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অংশিদার মো. বেলাল হোসেনকে একাধিকবার ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি।
কুড়িগ্রাম সদর এলজিইডি’র ইঞ্জিনিয়ার মো. ফিরোজুর রহমান
বলেন, সাইট অফিস বলতে একটি টিনের ঘর রয়েছে। যেভাবে সাইট অফিস নির্মাণের নির্দেশনা ছিল
সেভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাইট অফিস নির্মাণ করেনি। এজন্য স্যার বলেছেন, ঠিকাদারকে
সাইট অফিসের বিল না দিতে।’
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ
ইউনুছ হোসেন বিশ্বাস বলেন, ‘সাইট ঘর নির্মাণ না করে বিল দেওয়ার কোনো সুযোগ নাই। কাজ
করতে হবে। কাজ না করলে বিল হবে না। আমরা শেষ সময়ে এই বিল কর্তন করতে পারব।