× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চালকদের ভাইরাল হওয়ার নেশায় বাড়ছে দুর্ঘটনা

কবির হোসেন

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৫ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

ভাইরাল হওয়ার নেশায় নানা বিপজ্জনক পথ বেছে নিচ্ছে তরুণরা। আর নেশার ফাঁদে পড়ে দুর্ঘটনায় প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছে। বিশেষ করে রাত হলেই ফাঁকা রাস্তায় মোটরসাইকেলের প্রতিযোগিতায় নামে একদল তরুণ। সড়ক-মহাসড়কে ওভার স্পিডে মোটরসাইকেল চালানো তাদের নেশা। আর সেই বেপরোয়া গতির দৃশ্যগুলো ভিডিও করে নিজেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করা। বিশেষ করে রাজধানীর তিনশ ফিট এলাকার সড়কে রাতের বেলায় এমন দৃশ্য মিলে অহরহ। অথচ এসব প্রতিযোগিতার নেশার ফাঁদে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় জীবন দিচ্ছে অনেকে।

শুধু মোটরসাইকেল চালকই নন, এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যায় বাসচালকদের মধ্যেও। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটরসাইকেল চালকদের বড় অংশ কিশোর ও যুবক। এদের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা প্রবল। এ ছাড়া মোটরসাইকেল কোম্পানিগুলোর গতি নিয়ে বিজ্ঞাপন দেখে এক ধরনের রোমাঞ্চ অনুভব করে বাইকারদের একটি অংশ বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাদের এই বেপরোয়া হওয়ার কারণে যারা সাবধানে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন তারাও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় পথচারী নিহত কিংবা আহতের ঘটনাও বাড়ছে।’

জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ফারজানা বিথীসহ ১৫ জন নারী-পুরুষ মিলে রাজশাহী থেকে কক্সবাজার গিয়েছিলেন। গত ১৬ নভেম্বর সকালে তারা কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে লোহাগাড়ার চুনতির জাঙ্গালিয়া এলাকায় গতিরোধে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে সেতুর নিচে খাদে পড়ে যায় তাদের বহরের এক বাইক। পরে আহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে এলে সাকিবুল হাসান (২৪) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। তার বাইকে থাকা সোহাগ নামে আরেকজন আহত হয়।

গত ২ নভেম্বর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে বগুড়া-নগরবাড়ি মহাসড়কের উপজেলার টেটিয়ার কান্দা এলাকায় বন্ধুরা মিলে মোটরসাইকেল প্রতিযোগিতায় নামেন। এ সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে রুহান নামে এক তরুণ নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন আরও একজন। এ ঘটনা নিয়ে শাহজাদপুর থানার উপপরিদর্শক এমদাদ হোসেন জানান, তিনটি মোটরসাইকেলে কয়েকজন তরুণ উল্লাপাড়া থেকে পাবনার দিকে প্রতিযোগিতা করে বিকট শব্দ ও দ্রুতগতিতে যাচ্ছিল। মোটরসাইকেল তিনটি শাহজাদপুর উপজেলার নরিনা ইউনিয়নের টেটিয়ার কান্দা এলাকায় পৌঁছালে একে অন্যের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি মেহগনি গাছের ওপর আছড়ে পড়ে। এ সময় দুই মোটরসাইকেল আরোহী ছিটকে পড়লে ঘটনাস্থলেই রুহান নামের একজন মারা যায়।

গত ৭ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের বাংলাদেশ হাট এলাকায় চার বন্ধু মিলে দুটি মোটরসাইকেল নিয়ে রেস করছিল। এ সময় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলেই আরিফ হোসেন (২২) ও স্বাধীন পাল (১৭) নামে দুই বন্ধু নিহত হয়। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন তাদের আরেক বন্ধু শাওন।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কে মোটরসাইকেলে রেস করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুজন। নিহতরা হলেনÑ রাজধানীর ইব্রাহিমপুর এলাকার জসীমউদ্দিনের ছেলে দীপ এবং মাটিকাটা এলাকার সেকান্দারের ছেলে সুমন। তারা দুজনই প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। কাঞ্চন হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ সোহেল রানা বলেন, বিকালে ঢাকা থেকে দীপ, সুমন ও রাব্বিসহ চার বন্ধু দুটি মোটরসাইকেলে পূর্বাচলে বেড়াতে আসেন। ৩০০ ফুট সড়কে তাদের দুটি মোটরসাইকেল রেস খেলার মতো পাল্লা দিয়ে বেপরোয়া গতিতে চলছিল। একপর্যায়ে দুটি মোটরসাইকেলই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৩০০ ফিট সড়কের ডিভাইডারের সঙ্গে ধাক্কা লেগে উল্টে যায়। এতে আরোহী চারজন ছিটকে রাস্তায় পড়ে গুরুতর আহত হন এবং একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরে যায়।

গত ১০ ডিসেম্বর নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কে হয়ে নওগাঁ সদর উপজেলার হাঁপানিয়া এলাকায় মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন উপজেলার একডালা পূর্বপাড়া গ্রামের আব্দুল আলিলের ছেলে মোস্তফা সর্দার (৫৫) ও পোরশা উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল মালেক। এ সময় তেঁতুলতলী এলাকায় নওগাঁ থেকে রাজশাহীগামী একটি বিআরটিসি বাস অন্য একটি বাসকে ওভারটেক করার সময় মোটরসাইকেলটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৯ হাজার ১১১ জন এবং আহত হয়েছে আরও ১৪ হাজার ৮১২ জন। এসব দুর্ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ১ হাজার ২৮৮টি যানবাহনের পরিচয় মিলেছে। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে মোটরসাইকেল (২৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ)। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যান ও লরি (২২ দশমিক ৬০ শতাংশ) এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যাত্রীবাহী বাস (১৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ)। পর্যায়ক্রমে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ কার-জিপ-মাইক্রোবাস, ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক এবং ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ নছিমন-করিমন-মাহিন্দ্রা-ট্রাক্টর ও লেগুনা। সংস্থাটির পরিসংখ্যান আরও বলছে, ২০২৫ সালে সড়কে দুর্ঘটনা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেড়েছে। আর সড়কে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় নিহত ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং আহত ১৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। এসব কর্মকাণ্ড ডিজিটালি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে আর এর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে ৯০ শতাংশ গাড়িতে স্মার্ট ডিভাইস রয়েছে। প্রতিটি গাড়িরই নম্বর প্লেট রয়েছে। ফলে সড়ক-মহাসড়কে যদি ক্যামেরায় আওতায় নিয়ে আসা যায় তাহলে ওভার স্পিডে রেস হোক কিংবা যেভাবেই গাড়ি চালাক আইন না মানলে অটো জরিমানা হবে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যারা মোটরসাইকেল তৈরি করে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রচার-প্রচারণায় গতির বিষয়টি চালকদের উৎসাহ বাড়াচ্ছে। কীভাবে ওপর থেকে জাম্প করে নিচে পড়তে এই দৃশ্যগুলো বিজ্ঞাপনে দেখাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে মোটরসাইকেল ঘিরে যুবকরা আরও উৎসাহিত হচ্ছে। মোটরসাইকেল কোম্পানির বিজ্ঞাপনের ভাব এবং ভঙ্গি এগুলো বিপজ্জনক। এসব বন্ধ করতে হবে। বরং কোম্পানিগুলোর মোটরসাইকেল বিক্রি করার সময় সচেতনামূলক একটি লিফলেট দেওয়া উচিত এবং সচেতনামূলক বিজ্ঞাপন দেয় যেন চালকরাও সচেতন হয়। এ পদক্ষেপগুলো সরকারই নিতে হবে। শুধু কিছু নাগরিক সংগঠনের মধ্যে দিয়ে এগুলো দূর করা সম্ভব না। এসব বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে। পারিবারিক সচেতন করতে হবে। নানা রকম উদ্যোগ নিতে হবে।

হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (অপারেশনস-হেডকোয়র্টার্স) হাবিবুর রহমান খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রতিযোগিতা করে মোটরসাইকেল চালানো বা যেকোনো গাড়ি চালানোর কোনো সুযোগ নেই। এসব বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং নেব। কেউ যদি আইন না মেনে অপ্রয়োজনীয় গতিতে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা কবলে পড়ে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, নেওয়া হবে

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা