দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথ
মেহেদী হাসান রনি, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৪৮ পিএম
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া নৌপথে যাত্রী পারাপারে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর পুরনো, প্রায় অকেজো লঞ্চে জোড়াতালি দেওয়া ইঞ্জিন ও ভাঙাচোরা বডি নিয়েই প্রতিদিন হাজারো নারী-শিশুসহ যাত্রী পারাপার হচ্ছে।
প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত চালকের অভাবের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির ঘাটতিতে কয়েকটি লঞ্চ অবাধে চলাচল করায় যেকোনো সময় বড় ধরনের নৌদুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন যাত্রীরা।
দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট অফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সড়ক যোগাযোগে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। প্রতিদিন সেখানে নারী, শিশুসহ হাজারো যাত্রী লঞ্চ পারাপার হয়। বর্তমানে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ১৬টি লঞ্চ চলাচল করছে। চলাচলকারী ওই লঞ্চগুলোর অধিকাংশই চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছরের পুরনো। প্রায় অকেজো হয়ে পড়া অনেক লঞ্চের ওপরে রঙের প্রলেপ থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিনসহ ভেতরের অনেক কিছইু জোড়াতালি দেওয়া। সেখানে প্রশিক্ষিত কোনো মাস্টার (চালক) না নিয়ে অনেক লঞ্চমালিক সামান্য বেতনে অনভিজ্ঞ হেলপার দিয়ে তাদের লঞ্চগুলো চালাচ্ছেন। পাশাপাশি প্রতিটি লঞ্চে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, ফায়ার বাকেট, প্রয়োজনীয় সংখ্যক লাইফ বয়া, ফাস্টএইডসহ জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন সরঞ্জাম থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ লঞ্চে তা নেই। এর মধ্যে ‘এমভি ফাতেহা নূর’ ও ‘এমভি নজীর’ নামের দুটি লঞ্চের আসবাবপত্র সবচেয়ে বেশি খারাপ। ভাঙাচোরা বডি নিয়েই ওই লঞ্চ দুটি অবাধে চলাচল করছে। এদিকে নৌদুর্ঘটনা এড়াতে লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএর। এজন্য দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া উভয় ঘাটে বিআইডব্লিউটিএর দুজন ট্রাফিক পরিদর্শক রয়েছেন। তারা টার্মিনালে সার্বক্ষণিক উপস্থিত থেকে যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও তাদের দায়িত্বহীনতায় লঞ্চমালিক ও সংশ্লিষ্ট লোকজন তাদের নিজ নিজ লঞ্চে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে লঞ্চ চালাচ্ছেন।
কালুখালী থেকে আসা ঢাকাগামী লঞ্চের যাত্রী আসাদ প্রামাণিক বলেন, এসব লঞ্চে চলাচল করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু লঞ্চে তাড়াতাড়ি নদী পারাপার হওয়া যায়। এজন্য লঞ্চে নদী পার হচ্ছি। তবে কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়গুলো দেখে দ্রুত লঞ্চগুলো মেরামত করা। ঝিনাহদহ থেকে আসা ঢাকাগামী যাত্রী আকলি বেগম বলেন, এসব লঞ্চে যাত্রী পারাপারের সময় যদি কোনো রকম দুর্ঘটনা ঘটে এই দায় ভার কে নেবে? নবীনগর থেকে আসা যাত্রী জয়নাল উদ্দিন বলেন, ‘ওই পার থেকে আসলাম মনে হলো জীবন হাতে নিয়ে এলাম, লঞ্চের যে অবস্থা। এগুলো দ্রুত মেরামত করা হোক তা না হলে বন্ধ করে দেওয়া হোক।’
দৌলতদিয়া ঘাটে কর্মরত বিআইডব্লিউটিএর ট্রাফিক পরিদর্শক মো. জাকির হোসেন বলেন, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ও আরিচা-কাজীরহাট নৌরুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোর মধ্যে এমভি ফাতেহা নূর এবং এমভি নজীর নামের লঞ্চ দুটির অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট লঞ্চের লোকদেরকে অনেকবার বলেছি। কিন্তু তারা কোনো কথাই শুনছেন না।
ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রী পারাপার প্রসঙ্গে এমভি ফাতেহা নূর লঞ্চের মালিক আব্দুল হালিম বলেন, ‘আমার লঞ্চের বডিতে সমস্যা রয়েছেÑ এ কথা সত্য। এখন বাজার (লঞ্চের ব্যবসা) খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। এ কারণে কাজ করাতে দেরি হয়েছে। তবে চলতি (ডিসেম্বর) মাসের মধ্যে আমি আমার লঞ্চের মোরামত কাজ করাব।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহনের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্তৃপক্ষ জানায়, ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া নৌপথে লঞ্চ চলাচলের কোনো সুযোগ নেই। ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ চলাচলের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্ট লঞ্চ মালিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।