রাজু আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৪২ পিএম
আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৩৯ পিএম
গত কয়েক দিনের শীতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন রাজশাহী দুর্গাপুর উপজেলার ষাটোর্ধ্ব হাফসা বেগম। জ্বর, প্রেশার এবং মাথাব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন বাড়িতে শুয়ে। স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকে এসেছেন ডাক্তার দেখাতে। সেখান থেকে ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে আবার বিনামূল্যে পেয়েছেন ৪ ধরনের ওষুধ।
জানতে চাইলে নিলুফার বেগম বলেন, বাইরে ডাক্তার দেখাতে গেলে ভিজিট নেয় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। আবার ওষুধও কিনতে হয়। সেজন্য বাইরে আমি যাই না। এখানে ডাক্তার দেখানোর পাশাপাশি ফ্রিতে ওষুধও পাই। এজন্য বাড়ির পাশের এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রই আমার কাছে ভালো।
হাফসা বেগমের মতো রাজশাহীর ৯টি উপজেলার অসহায় দরিদ্র মানুষের কাছে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবায় ভরসার নাম কমিউনিটি ক্লিনিক। এ ছাড়াও মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় আস্থার স্থল হয়ে উঠেছে এই ক্লিনিক। বাড়ির কাছাকাছি হওয়ায় এবং সেখানে বিনামূল্যে সাধারণ রোগের ওষুধ পাওয়া যায় বলে এখানে রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
এখানে কর্মরত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারীরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকেন। যেমন : স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সেবা সম্পর্কে উদ্বুদ্ধকরণ; প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সেবা প্রদান; মা ও শিশুর খাদ্য ও পুষ্টির বিষয়ে সহায়তা প্রদান; ছোঁয়াচে রোগবালাই থেকে দূরে থাকার বিষয়ে পরামর্শ দান এবং জটিলতর রোগের চিকিৎসার জন্য উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়ে থাকে।
সরেজমিন জেলার কয়েকটি উপজেলায় গেলে দেখতে পাওয়া যায়, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের লম্বা সিরিয়াল দেখা যায়। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের পাশাপাশি এখানে ২৭ প্রকার ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন করে জানা যায়, এখানে সার্বিক প্রজনন স্বাস্থ্য পরিচর্যার আওতায় গর্ভবতী মহিলাদের প্রসবপূর্ব (প্রতিষেধক টিকাদানসহ) এবং প্রসবপরবর্তী (নবজাতকের সেবাসহ) সেবা দেওয়া হয়। এই ক্লিনিকগুলো সময়মতো প্রতিষেধক টিকাদান শিশু ও কিশোর কিশোরীদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। জনগণের জন্য বিশেষ করে মহিলা ও শিশুদের অপুষ্টি দূর জন্য ফলপ্রসূ ব্যবস্থা গ্রহণ ও সেবা দেওয়া হয়। যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, কালা-জ্বর, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং সেগুলোর সীমিত চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। সাধারণ জখম, জ্বর, ব্যথা, কাটা-পোড়া, দংশন, বিষক্রিয়া, হাঁপানি, চর্মরোগ, ক্রিমি এবং চোখ, দাঁত ও কানের সাধারণ রোগের ক্ষেত্রে লক্ষণভিত্তিক প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
অস্থায়ী পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সংক্রান্ত বিভিন্ন উপকরণ, যেমÑ কনডম, পিল, ইসিপি ইত্যাদি সার্বক্ষণিক সরবরাহ ও বিতরণ নিশ্চিত করা হয়। জটিল রোগীদের প্রাথমিক সেবা দিয়ে দ্রুত উচ্চতর পর্যায়ে পাঠানো হয়। সদ্য বিয়ে করা ও অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের নিবন্ধিকরণ ও সম্ভাব্য প্রসব তারিখ সংরক্ষণ করতে হয়। মহিলা ও কিশোর-কিশোরীদের রক্তস্বল্পতা শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়ে থাকে এই কমিউনিটি ক্লিনিকে।
সারা দেশে ১৩ হাজার ৩৭৬টি এবং রাজশাহীতে ২৩৫টি কমিউনিটি ক্লিনিকে চালু রয়েছে। সরকারের পৃথক দুটি জরিপে এসব ক্লিনিক নিয়ে ৮০ থেকে ৯৮ শতাংশ মানুষ তাদের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের এর এক জরিপে দেখা গেছে, বাড়ির পাশের ক্লিনিক থেকে ওষুধ আর পরামর্শ পেয়ে ৮০ শতাংশ মানুষই সন্তুষ্ট। জাতীয় রোগ প্রতিরোধ ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এর জরিপে দেখা যায়, সেবা নিয়ে ৯৮ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট।
পুবার সখিনা বেওয়া নামের এক রোগ বলেন,‘বাইরে এখন ডাক্তারদের যে সিন্ডিকেট। টাকা ছাড়া কোনো পরামর্শ পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা এই ক্লিনিকে ডাক্তারদের পরামর্শের পাশাপাশি এখান থেকে টাকা ছাড়াই ওষুধ পাই। এটি আমাদের জন্য অনেক উপকারী।’ হাসনা হেনা জানান, কমিউনিটি ক্লিনিক আমাদের জন্য অনেক উপকারী। আমরা এখান থেকে নিয়মতি ওষুধসহ প্রেসক্রিপশন পেয়ে থাকি। আমরা চাই এই ক্লিনিকগুলো আরও আধুনিক মানের এবং এখানে রোগ নির্ণয়ের জন্য মেশিন বসানো হোক। যাতে আমরা চিকিৎসাসেবা আরও ভালো পাই।
পবা উপজেলা মধুসূদনপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি নূর আলম বলেন, এই কমিউনিটি ক্লিনিকের কারণে দেশের দরিদ্র মানুষ আজ সঠিক ভাবে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে রোগীর সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক রেড়েছে। আমার এখানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ জন রোগীকে সেবা দেওয়া হয়। মাঝে মাঝে রোগীর সংখ্যা এর চেয়ে বেশিও হয়।
রাজশাহী জেলার সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম বলেন, প্রাথমিক চিকিৎসাসেবায় কমিউনিটি ক্লিনিক কাজ করছে। তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিক কাজ করছে। রাজশাহীতে ২৩৫টি কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবাসহ ২২ প্রকার ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। আমাদের এখানে সহকারী স্বাস্থ্যকর্মী এবং এফডিবিউপিএ কোনটির পদ ফাঁকা নেই। তবে কিছু ভবন পুরনো হয়ে যাওয়ায় তা সংস্কার করতে হবে। যাবতীয় চিকিৎসাসেবাসহ বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। মাঝে মাঝে ওষুধ সরবরাহ করতে দেরি হয়ে গেলে ক্লিনিকগুলোয় ওষুধের সংকট দেখা দেয়, তবে তা খবুই সামান্য সময়ের জন্য।