× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সুনামগঞ্জে দালালের ফাঁদে নিঃস্ব শতাধিক তরুণ

সুনামগঞ্জ প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৩৯ পিএম

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৫৩ পিএম

সুনামগঞ্জে দালালের ফাঁদে নিঃস্ব শতাধিক তরুণ

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমানের ছেলে মো. শাকিল আহমদ। এলাকার এক দালালের মাধ্যমে কয়েক দেশ পেরিয়ে লিবিয়ায় পৌঁছানোর চুক্তি করেন তিনি। প্রাথমিকভাবে সাড়ে ৪ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। টাকা পরিশোধের পর প্রথমে দুবাই যান শাকিল। সেখানে এক মাস অবস্থান শেষে অবৈধভাবে মিসরে প্রবেশ করেন এবং পরদিন লিবিয়ায় পৌঁছান।

লিবিয়ায় পৌঁছে শরীয়তপুরের এক দালালের সঙ্গে আবারও নতুন করে সাড়ে ৬ লাখ টাকায় চুক্তি করেন। দালাল তাকে আশ্বাস দেয়, গেমের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছে দেওয়া হবে। টাকা পরিশোধের পর ৪৮ জনের একটি দলের সঙ্গে গেমের অপেক্ষায় থাকেন শাকিল। কিন্তু কিছুদিন পর দালাল নিজেই তাদের লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়।

পরে দালাল চক্র ওই বাহিনীর কাছ থেকে কয়েকজনকে কিনে নেয় এবং তাদের ওপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। শাকিলসহ অনেকে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন। এখন তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন, আর পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে গেছে দালালের প্রতারণায়।

শাকিল আহমেদ বললেন, অনেক স্বপ্ন ছিল ইতালি যাওয়ার। এলাকার পরিচিত একজন বললেন, দুবাই থেকে মিসর হয়ে লিবিয়া যেতে হবে, তারপর সেখান থেকে নিরাপদে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছানো যাবে। লিবিয়া পর্যন্ত যেতে খরচ হবে সাড়ে চার লাখ টাকা। এমন প্রস্তাবে রাজি হয়ে প্রথমে দুবাই যাই। সেখান থেকে বিভিন্ন পথ পেরিয়ে লিবিয়ায় পৌঁছাই। লিবিয়ায় গিয়ে শরীয়তপুরের এক দালালের সঙ্গে নতুন করে সাড়ে ছয় লাখ টাকায় চুক্তি করি ইতালি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। আমার সঙ্গে আরও অনেকেই ছিল। সবাই টাকা পরিশোধ করার পর দালালই আমাদের লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। আমাদের সঙ্গে যারা আটক হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে পাঁচজনকে ওই দালাল টাকা দিয়ে কিনে নেয়। পরে তাদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন এবং পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। এরপর তাদের খবর আর পাইনি।

তিনি বলেন, মানুষের কাছ থেকে ধার-দেনা নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম কষ্ট করে উপার্জন করে ঋণ শোধ করব। কিন্তু এখন সবকিছু হারিয়ে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি।

শুধু শাকিল নয়, এরকম আরও অনেক তরুণ উন্নত জীবনের আশায় অনিয়মিত অভিবাসনের দিকে ঝুঁকছেন। 

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম প্রত্যাশা-২ প্রকল্পের তথ্যমতে, গত দুই বছরে লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার ২৬৫ জন তরুণ। তারা সবাই দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথে ইউরোপের দেশ ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু স্বপ্নের ইউরোপযাত্রা শেষ পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। প্রায় ১৮ থেকে ২৫ লাখ টাকা খরচ করেও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি কেউ। দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব ও দিশাহারা হয়ে পড়েছেন এসব তরুণ ও তাদের পরিবার। এদের মধ্যে অনেকেই লিবিয়ায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

একই ইউনিয়নের ভাটি সাফেলা গ্রামের বাসিন্দা জাকারিয়া আহমেদ ইয়াহিয়া জানান, দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ থেকে দুবাই, মিসরসহ আরও একটি দেশ হয়ে লিবিয়া যেতে তাকে দিতে হয়েছিল ৪ লাখ টাকা। লিবিয়ায় পৌঁছে আরও ৪ লাখ টাকায় চুক্তি করেন গেমে সমুদ্রপথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার জন্য।

তিনি বলেন, গেমে থাকতে হয়েছে ৮ থেকে ৯ মাস। কখনও একবেলা খেয়েছি, কখনও না খেয়ে দিন কেটেছে। পরে দালাল আমাদের ১২০ জনকে একটি নৌকায় তুলে দেয়। কিন্তু সাগরের মাঝপথে লিবিয়ার কোস্ট গার্ড আমাদের আটক করে। পরে পাঁচ দিন কারাভোগের পর কুমিল্লার মাফিয়া রাসেল নামে এক ব্যক্তি আমার সঙ্গে আরও এক বাংলাদেশিকে কিনে নেয়। তার বাড়িতে আরও অনেক মানুষ আটক ছিল। সবাইকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা নিতে বাধ্য করা হয়। যারা টাকা দিতে পারেনি, তাদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন।

জাকারিয়া বলেন, আমাকে বলা হয়, দুই দিনের মধ্যে বাড়ি থেকে ৬ লাখ আনতে। আমি বাড়ির জমি বিক্রি করে টাকা পাঠাতে বলি। পরিবার দুদিনের মধ্যে টাকা পাঠানোয় আমাকে ছেড়ে দিয়েছে। 

তিনি আরও জানান, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফিরেছি। এখনও ধারদেনা পরিশোধ করতে পারিনি। তবে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রত্যাশা-২ প্রকল্পের মাধ্যমে একটি ইজিবাইক পেয়েছি। এখন সেই ইজিবাইক চালিয়েই সংসার চালাই।

গত বুধবার দুপুরে ব্র্যাক মাইগ্রেশনের প্রোগ্রামের প্রত্যাশা-২ প্রকল্পের অধীনে হাজিপাড়ার অফিসে প্রবাসবন্ধু ফোরামের ত্রৈমাসিক সভায় বক্তারা বলেন, অনিরাপদভাবে ইউরোপে যাওয়ার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিরিয়া। পর্যায়ক্রমে রয়েছে তিউনিশিয়া, মিসর, গিনি, পাকিস্তান, ইরিত্রিয়া, সুদানসহ আরও কয়েকটি দেশ। এ ছাড়া গত বছরে বাংলাদেশ থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ উন্নত জীবনের স্বপ্ন ও কর্মসংস্থানের আশায় বৈধভাবে বিদেশ গিয়েছেন। সে হিসেবে প্রতি ঘণ্টায় বিদেশ যাচ্ছেন ১১৫ জন। এদের বড় অংশই দক্ষ নয়। বিশ্বে ৩০ কোটি অভিবাসীর মধ্যে বাংলাদেশের এক কোটির বেশি মানুষ রয়েছেন। গত বছরে এই এক কোটি প্রবাসীর আয় এসেছে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার।

প্রবাসবন্ধু ফোরামের সভা শেষে কাউন্সিল অধিবেশনের মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে মাজেদা আক্তারকে সভাপতি, আব্দুল মতলিবকে সাধারণ সম্পাদক ও মিনা পালকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়।

ব্র্যাকের এমআরএসসি কোঅর্ডিনেটর নজরুল ইসলাম বলেন, দালালের খপ্পরে পড়ে অনেকে বিদেশ পাড়ি দেন। সুনামগঞ্জে ২৬৫ জন তরুণ দালালের মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে লিবিয়া থেকে ফেরত এসেছেন। যারা ফেরত এসেছেন তাদের তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। অনেকেই লিবিয়া থেকে গেমে ইতালি যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা যান। তাদের তথ্য নেই আমাদের কাছে। 

তিনি বলেন, প্রতারণার শিকার হওয়া ব্যক্তিরা অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। পুরো পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এক্ষেত্রে ফেরত আসা ব্যক্তি অনেক সময় পরিবারের উপরও বোঝা হয়ে দাঁড়ান। তাদের আবারও সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করি আমরা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা