অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৩৭ পিএম
টাঙ্গাইল শহরের কেন্দ্রস্থল নিরালা মোড় থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে গেলে জেলা সদরের গোল চত্বর। ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে গিয়ে মিশেছে গোল চত্বরের পশ্চিম পাশের অংশ। এখানে দাঁড়িয়ে তাকালে দু’চোখে ভেসে উঠে ধলেশ্বরীর বুকে জেগে ওঠা বিশাল চর আর তার ফসল আবাদের দৃশ্য। নদীটি উত্তর-দক্ষিণে বয়ে গেছে। ভরা বর্ষার সময় দুকূল ছাপিয়ে পানির দেখা মিললেও বছরের অধিকাংশ সময় চর জেগে থাকে। সেখানে ধুমছে আবাদ হয় বিভিন্ন জাতের ফসল। শুকনো মৌসুমে মূল নদীর পানিও শুকিয়ে যায়। সেখানেও তখন ফসলের আবাদ হয়।
গোলচত্বর থেকে পশ্চিম-উত্তর দিকে রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে ডানে-বামে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে দেখা যাবে চরের উঁচু-নিচু জায়গায় সবুজ আভা ছড়িয়ে চাষ হচ্ছে ফসল। গোলচত্বর থেকে ধলেশ্বরী নদী পার হয়ে যেতে হয় নাগরপুর উপজেলায়। তা ছাড়া এখান দিয়ে সিরাজগঞ্জের চৌহালী ও জোতপাড়া যাওয়ার সহজ রাস্তাও এটি।
জেলা সদরের গোলচত্বর, বহুলী, করিমগঞ্জ ও মাকোরকোল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ধলেশ্বরী নদীর মূল অংশে অল্প পরিমাণ পানি রয়েছে। তার পাশ দিয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে আবাদ করা হয়েছে বিভিন্ন ফসল। তার একটু ওপরে বালি। আরেকটু ওপরে বিশাল এলাকাজুড়ে আবাদ হচ্ছে সবুজ রঙের ফসল। নিচু এলাকায় বরো ধানের চারা রোপণ করা হচ্ছে। একটু উঁচু জায়গায় আবাদ করা হয়েছে গম, ভুট্টা, মাষকলাই, খেসারী কলাই, সরিষা, কলা। কোথাও গো-খাদ্য হিসেবে চাষ করা হয়েছে ঘাস। গোলচত্বর এলাকায় উঁচু পাড়ে দাঁড়িয়ে পশ্চিম দিকে তাকালে বিভিন্ন ফসল আবাদের দৃশ্য দেখা যায়।
নাগরপুর উপজেলার খাষশাহজানী গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, পাঁচ-ছয় বছরে ধলেশ্বরী নদীর টাঙ্গাইলের অংশে বিশাল জায়গাজুড়ে চর পড়েছে। সেখানে নানা ধরনের ফসল আবাদ হচ্ছে। ভরা বর্ষা ছাড়া এসব জায়গায় এখন আর পানি থাকে না।
ধলেশ্বরী নদীর পার্শ্ববর্তী পাড় বহুলী গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, সাত-আট বছর আগেও ধলেশ্বরীর গোলচত্বরের পশ্চিম অংশে পানি থাকত। কয়েক বছরের মধ্যে সেখানে চর উঠেছে। বন্যার সময় ছাড়া বছরের বেশি সময় এখানে পানি থাকে না। মাটি ভালো থাকায় এখানে বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়।
তিনি বলেন, আমি এবার প্রায় ১০০ শতাংশ জায়গায় ভুট্টা আবাদ করছি। গাছ খুব ভালো হইছে। পাঁচ বছর ধরে এখানে ধানের আবাদ করি। ফলন ভালোই হয়। অপর চাষি সুবহান শেখ। তিনি ধলেশ্বরীর চরের এক জাহার ১৫০ শতাংশ জায়গায় বিভিন্ন ফসল আবাদ করেছেন। তিনি জানান, ১৫০ শতাংশ জায়গায় গম, ২০০ শতাংশ জায়গায় মাষকলাই, ১৫০ জায়গায় খেসারী কলাই এবং বাকি জায়গা বুরো ধান আবাদ করছেন।
কৃষিবিষয়ক লেখক কৃষিবিদ ফরহাদ আহম্মদ বলেন, বন্যার সময় নদীর পানিতে বিভিন্ন গাছপালা ভেসে যায়। সেগুলো পচে জৈবসার তৈরি হয়। বন্যা-পরবর্তী সময় নদীর চরাঞ্চলে পলিমাটি জমে। পানির কারণে তৈরি হওয়া জৈবসার মাটিতে পড়ে। সেই সার মাটিতে খাদ্যপুষ্টির উপাদান তৈরি করে। এজন্য চরাঞ্চলে বিভিন্ন ফসল ভালো উৎপাদন হয়।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চরাঞ্চলের জন্য ফসল আবাদের নির্ধারিত পরিসংখ্যান করা হয় না। চর সংশ্লিষ্ট উপজেলার পরিসংখ্যানের সঙ্গেই এটি যুক্ত থাকে। এ বছর চরাঞ্চলসহ জেলায় এ পর্যন্ত সরিষা চাষ হয়েছে ৭৪ হাজার ৯৭৫ হেক্টর, ভুট্টা আট হাজার ২৩ হেক্টর, গম তিন হাজার ৩০০ হেক্টর, সবজি দশ হাজার ৪৯৩ হেক্টর, খেসারী এক হাজার ৫৬২ হেক্টর, মাষকলাই তিন হাজার ৯০৭ হেক্টর জমিতে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আশেক পারভেজ বলেন, বন্যা-পরবর্তীতে রবি ফসলটা আসে একটা সম্ভাবনা নিয়ে। পলি পড়ে এই সম্ভাবনাটা দেখা দেয়। এই সম্ভাবনাময় ফসলের মধ্যে অন্যতম ভুট্টা, গম, মাষকলাই, খেসারী কলাই, তিল, চিনাবাদাম, মরিচ। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর সেখানকার জমি উর্বর হয়। ফলে ফসল দ্রুত বর্ধন হয়। এখানে আবাদের খরচও তুলনামূলক কম হয়।