রাশিদুল ইসলাম রাশেদ, কুড়িগ্রাম
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:০২ পিএম
আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:০৬ পিএম
কাগজে-কলমে এটি ‘উন্নয়ন প্রকল্প’, বাস্তবে যেন অনিয়ম আর অবহেলার এক খোলা প্রদর্শনী। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ সড়ক কুড়িগ্রাম হরিকেশ মোড় আরএইচভি থেকে কাঁঠালবাড়ী জিসি ভায়া হলোখানা ইউসিপি সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ৪৬ লাখ ১৪ হাজার ৯৬৯ টাকা। ৯ দশমিক ৮০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সড়কে প্রতি কিলোমিটারের ব্যয় প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
স্থানীয়দের ভাষায়, ‘সোনায় মোড়ানো’ এই সড়কের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও শেষ হয়নি অর্ধেকও। সড়কের ভিতরে জীবন্ত গাছ রেখেই কার্পেটিংয়ে তড়িঘড়ি করছে নিয়োজিত ঠিকাদার। এতে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের ৩০ জুন। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। উল্টো প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরএবি-আরসি-বিসি-এইচটি জেভির বিরুদ্ধে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ পুরনো গাইডওয়াল তুলে নেওয়া হলেও নতুন গাইডওয়াল নির্মাণ করা হয়নি। প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৬০৭ মিটার গাইডওয়াল (প্যালিসাইডিং ওয়ার্ক) নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে বহু স্থানে তা নেই। অথচ নকশা অনুযায়ী প্রথম ধাপে গাইডওয়ালের পুরুত্ব ১৫ ইঞ্চি ও উচ্চতা ২০ ইঞ্চি, দ্বিতীয় ধাপে পুরুত্ব ১০ ইঞ্চি ও উচ্চতা ২০ ইঞ্চি হওয়ার কথা।
সুভারকুটি এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাড়ির পাশে ১০-১৫ ইঞ্চি প্রস্থের গাইডওয়াল ছিল। ঠিকাদারের লোকজন তা তুলে নিয়ে গেছে। বলেছিল নতুন ওয়াল হবে। দেড় বছরেও তারা নতুন গাইডওয়াল করে নাই।’
একই এলাকার চাঁদের পুকুর ঘেঁষে প্রায় ১৯০ ফুট গাইডওয়াল তুলে নেওয়ার অভিযোগ করেন পুকুরটির মালিক সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘পুকুরের গভীরতা ২০-২৫ ফুট। গাইডওয়াল তুলে নেওয়ার পর দুইবার মাটি ধসে গেছে। একটু ভারী বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তা ভেঙে যাবে।’
নিম্নমানের খোয়া, ধুলোয় নাকাল জনজীবন
সড়কটি নির্মাণ হওয়ার কথা ছিল ডব্লিউএমএম (ওয়েট মিক্স ম্যাকাডাম) পদ্ধতিতে। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির ইট, ১ দশমিক ৫ ইঞ্চি খোয়া ও পরে ১০ মিলিমিটার খোয়া ব্যবহারের কথা। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে, এমনকি গাইডওয়াল থেকে তোলা ইট ভেঙে খোয়া বানানো হয়েছে।
আমিনুর রহমান নামের এক কাঠমিস্ত্রি বলেন, ‘গাইডওয়ালের ইট ট্রাক্টরে করে নিয়ে গেছে। দুই-তিন দিন ধরে ইট তুলেছে। পরে সেই ইট ভেঙে খোয়া বানানো হয়েছে। সেই খোয়ার মান খুবই খারাপ।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, হরিকেশ মোড় থেকে বাউদিয়া ছড়া ও খলিফার মোড় এলাকায় সড়কের অবস্থা বেহাল। ধুলোবালিতে নাকাল স্থানীয় মানুষ। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় বাড়ছে বায়ুদূষণ। সড়কের পাশের জমিতে শাকসবজি চাষও ব্যাহত হচ্ছে।
প্রশ্নের মুখে এলজিইডির তদারকি
এলাকাবাসীর অভিযোগের তীর গিয়ে ঠেকেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) দিকে। তাদের ভাষায়, যথাযথ তদারকি থাকলে এমন অনিয়ম সম্ভব হতো না।
এ বিষয়ে নিয়োজিত যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার মো. আব্দুল হামিদ বলেন, ‘আমরা যথাযথভাবেই কাজ করছি। আমাদের কাজে কোনো ত্রুটি নেই।’ তবে এ প্রতিবেদককে সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান তিনি।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রকৌশলী (অ. দা.) ফিরোজুর রহমান বলেন, ‘অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি কাজ আমরা বুঝে নিচ্ছি। এখন পর্যন্ত ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আমরা ৩৮ শতাংশ বিল দিয়েছি। ঠিকাদার কর্তৃক পুরাতন গাইডওয়াল তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি আমার জানা নেই।’
এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম স্থানীয় সরকার প্রকৌশলর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইউনুছ হোসেন বিশ্বাস বলেন, ‘অনিয়ম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। যেভাবে কাজের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে আমরা সেভাবেই কাজ বুঝে নেব। যদি অনিয়ম হয়েই থাকে সে ক্ষেত্রে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
১৫ কোটি টাকার প্রকল্পে এত অনিয়ম, ধীরগতি আর দায়সারা কাজ সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, এই সড়ক কি মানুষের যোগাযোগের জন্য, নাকি অনিয়মের ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’?