× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইপিজেড নির্মাণে নিম্নমানের উপাদান

তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর

প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:৪৬ পিএম

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:৫৩ পিএম

ইপিজেড নির্মাণে নিম্নমানের উপাদান

যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ ইউনিয়নের চেঙ্গুটিয়া, মহাকাল, প্রেমবাগ, বালিয়াডাঙ্গা, আমডাঙ্গা, আরাজি বাহিরঘাট, মাগুরা ও রাজাপুর মৌজায় ৫০৩ একর জায়গা জুড়ে ১ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকার বিনিময়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র যশোর ইপিজেড নির্মিত হচ্ছে।

দেশে বিনিয়োগ আহরণ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্যে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শুরু না করে অনেক পরে কাজ শুরু করায় তড়িঘড়ি করে নিম্নমানের ইট, রড ও সিমেন্টের ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘ ৬ বছর মেয়াদি ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বেপজার বোর্ড অব গভর্নরের ৩৪তম সভায় রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন ১ জানুয়ারি ২০২৪, মেয়াদ শেষ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রকল্পের অধীনে ৪০০টি শিল্প প্লট তৈরি হবে। তিন ক্যাটাগরিতে এসব প্লট বরাদ্দ দেওয়া হবে। এ ক্যাটাগরিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের, বি ক্যাটাগরিতে দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগকারীদের এবং সি ক্যাটাগরিতে শুধু দেশি বিনিয়োগকারীদের প্লট বরাদ্দ দেওয়া হবে। প্রতিটি প্লটের আয়তন ২০০০ বর্গমিটার।

অনেক আগেই প্রকল্প কর্মকর্তার পক্ষ থেকে টেন্ডারও দেওয়া হয়েছে। এসব টেন্ডার পেয়েছে পতিত সরকার আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন ঠিকাদাররাই। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ না করে বিভিন্ন মাধ্যমে নিম্নমানের উপাদান দিয়ে ইপিজেড উন্নয়ন কাজ করার অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৫ প্যাকেজে এ বিপুল অর্থের কাজের ঠিকাদারি পেয়েছে ১৪ জন। এদের মধ্যে মইনুল ইসলাম খোকনের মালিকানাধীন এনডিকে-সিএল জেভির পেয়েছেন ১৫৪ কোটি টাকার মাটি ভরাট, এসসিবি অ্যান্ড এসইবি রাস্তা নির্মাণের জন্য বরাদ্দ পেয়েছেন ৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, নীলফামারীর লিমনের মালিকানাধীন খাজা বিলকিস বরাদ্দ পেয়েছেন ৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা, Hcpc প্রাইভেট লিমিটেড খাল খননে বরাদ্দ পেয়েছে ১৬ কোটি টাকা এবং একই প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টরি বিল্ডিং নির্মাণে বরাদ্দ পেয়েছেন ৬০ কোটি টাকা, এনাম হুদার হুদা অ্যান্ড কেটিএ জেভি ফ্যাক্টরি নির্মাণে বরাদ্দ পেয়েছেন ৬০ কোটি টাকা, ঢাকার ফারুক হোসেনের মালিকানাধীন কেএসএল সিন্ডিকেট ফ্যাক্টরি বিল্ডিং নির্মাণে পেয়েছে ৬১ কোটি টাকা, যশোর খুলনা অঞ্চলের এইচবিবি ব্রাদার্সের সাথে রাস্তা নির্মাণে চুক্তি হয়েছে ৫২ কোটি টাকা, নাসিম অ্যান্ড তুহিন স্থানীয় ঠিকাদার এক্স ড্রোন পেয়েছেন ৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, ঢাকার নবাব এর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এসবিবি (ব্রাদার্স অ্যান্ড ব্রাদার্স) ইপিজেডের মেইন রোড নির্মাণে বরাদ্দ পেয়েছেন ১৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, আরএনএন-এস এইচকেসিএল অ্যান্ড এসই জেভি পেরিফেরি রোড নির্মাণে বরাদ্দ পেয়েছেন ১৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, ঢাকার গাজীপুরের আমিনুল ইসলামের মালিকানাধীন প্রবাল ইঞ্জিনিয়ার লিমিটেড পেয়েছেন অফিসার ডরমিটরি নির্মাণে ১৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, ঢাকার গ্রিন রোড এলাকার মাহবুবুর রহমানের মালিকানাধীন এমআরএম ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি ব্যারাক নির্মাণে বরাদ্দ পেয়েছেন ১০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, নাজিম অ্যান্ড নবাবের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিবিসি অ্যান্ড এসই জেবি আনসার ব্যারাক নির্মাণে বরাদ্দ পেয়েছেন ১০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, গুলশানে মোশারফ হোসেনের মালিকানাধীন পন্ডিত কনস্ট্রাকশন প্রকল্প এলাকায় ১১ কেভি বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণে বরাদ্দ পেয়েছেন ৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

বৃহস্পতিবারে প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ইপিজেডের প্রধান সড়ক নির্মাণকারী এসসিবি অ্যান্ড এসইবি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ইঞ্জিনিয়ার শিমুল নিজে থেকেই মুন ইটের ভাটার নিম্নমানের ইট দিয়ে সড়ক সলিং করছে। নিম্নমানের ইটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাকে যা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমি তাই করছি। এর বেশি কিছু জানার থাকলে ইপিজেডের ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে জানার পরামর্শ দেন তিনি।

অন্যদিকে Hcpc প্রাইভেট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানের ১৬ কোটি টাকা মূল্যের খাল খনন ও ব্রিজ নির্মাণে ব্যবহার হচ্ছে নিম্নমানের রড। যেগুলো ব্যবহারের আগেই মরিচা ধরে আস্তরণ আশ খসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বেপজার সাইড ইঞ্জিনিয়ার বাবুর আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো পরীক্ষা করেই নেওয়া হয়েছে। সরকারের নীতিমালা মেনে ঢালাই কাজ চলছে।

উড়োতলার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন জানান, শুনেছি এখানে তিন থেকে চার লাখ লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। অথচ এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের ইট রড ও সিমেন্ট। আমরা যেটাকে তিন নম্বর ইট বলি সেইটাই এখানে ব্যবহার হচ্ছে। এ ধরনের ইট দিয়ে কাজ করা হলে কাজ শেষ হওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যাবে। ঠিকাদার ও ইপিজেডের কর্মকর্তাদের নির্দেশে এটা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। তা ছাড়া রডগুলো ব্যবহারের আগেই মরিচা ধরে গেছে।

বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের সাকিব হোসেন বলেন, সরকারি বড় প্রকল্পের জন্য আমার পরিবারের প্রায় ২৫ বিঘা জমি প্রকল্পে দিয়েছি। প্রকল্পের কাজের শুরুতেই নিম্নমানের ইট রড সিমেন্ট ব্যবহার করাতে আমরা হতাশ। সরকারের প্রতি তিনি এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখার নিবেদন জানিয়েছেন। শুধু শাকিব আলমগীর নয়, তাদের মতো অনেকেরই কাজের শুরুতেই অনিয়ম দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয়দের মতে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বড় বড় প্রকল্প দিয়ে অনিয়ম দুর্নীতি করে কর্মকর্তারা কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। তবে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও এখনো দুর্নীতিবাজরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ প্রকল্প তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই ইপিজেডের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

প্রকল্প পরিচালক মো. ইউসুফ পাশার কাছে প্রকল্পে নিম্নমানের ইট রড সিমেন্ট ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নতুন পোড়ানো ইট যে কারণে এক নম্বর ইট তিন নম্বরের মতো দেখা যাচ্ছে। রডের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন খোলা আকাশের নিচে রড এক থেকে দুই দিন পড়ে থাকলে তা মরিচা ধরে যায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে ব্যবহৃত রড প্রথম গ্রেডের কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা কোনো মুখ্য বিষয় নয়। যেকোনো উপাদান টেস্টে উত্তীর্ণ হলে তা ব্যবহার করা যাবে। 

তিনি আরও বলেন, ইপিজেডের উন্নয়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৩০%। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্ভব হবে না। এখনও সময় থাকায় কাজের মেয়াদকাল বাড়ানো হয়নি। তিন মাস থাকতে কাজের মেয়াদকাল বাড়ানো হবে।

বিষয়টি নিয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি নজরে আনার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমি এখনই বিষয়টি খোঁজখবর নিচ্ছি। নিম্নমানের উপাদান দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম চালালে অবশ্যই কাজ বন্ধ করা হবে।

উল্লেখ্য, ইপিজেডের কাজ শেষ হলে এখানে প্রত্যক্ষভাবে চার থেকে সাড়ে চার লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ২ হাজার মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আহরণ এবং বার্ষিক প্রায় ২ হাজার ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি মিলবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা