কয়রা
কয়রা (খুলনা) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:৪৩ পিএম
আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:৫৩ পিএম
খুলনার কয়রা উপজেলায় গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির (কাবিখা, কাবিটা ও টিআর) আওতায় বাস্তবায়িত একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের কাজ না করেই কিংবা নামমাত্র কাজ করে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, ছয় মাস আগেই কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে অধিকাংশ প্রকল্পে কাজ শুরুই হয়নি। আবার যেসব প্রকল্পে আংশিক কাজ হয়েছে, সেখানে বরাদ্দের তুলনায় ব্যয় হয়েছে খুবই সামান্য। বিল ছাড়ের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একটি অংশকে বরাদ্দের ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়েছে বলে জানান একাধিক সূত্র।
সরেজমিন দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা-চাল) কর্মসূচির আওতায় মহারাজপুর ইউনিয়নের পশ্চিম দেয়াড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আয়শার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মাটি দ্বারা উন্নয়নের জন্য ৫ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্প গ্রহণের ১৫ দিনের মধ্যে কাজ শুরুর কথা থাকলেও দীর্ঘ সময় পার হলেও সেখানে কোনো কাজ হয়নি।
এ বিষয়ে প্রকল্প সভাপতি ও সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য আমেনা খাতুন বলেন, কাজের বিষয়টি তার ছেলে দেখাশোনা করেন। তবে তার ছেলে আরাফাত হোসেন জানান, ওই স্থানে তারা কোনো কাজ করেননি। চেয়ারম্যান করেছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি জানেন না।
মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ দাবি করেন, ওই প্রকল্পে এ বছর কোনো কাজ হয়নি এবং সব বিলও উত্তোলন করা হয়নি।
একই ইউনিয়নে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় দেয়াড়া বড়বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পুকুরের ঘাট নির্মাণে ৪ লাখ ২২ হাজার ৬২০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে কোনো কাজের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান জানান, অর্ধেক টাকা উত্তোলনের পর কিছু সমস্যার কারণে কাজ করা সম্ভব হয়নি।
কয়রা সদর ইউনিয়নের জামিয়া মোহাম্মাদিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার মাঠ ভরাটে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও বিল ভাউচারে ৪৮ হাজার টাকার বালু উত্তোলনের কথা উল্লেখ রয়েছে। একই ভাউচারে ৫৪ হাজার টাকা পিআইও অফিসে দেওয়ার উল্লেখ পাওয়া গেছে। টেপাখালী লঞ্চঘাট সড়কে ৫ টন চাল বরাদ্দ থাকলেও সেখানে কোনো কাজ হয়নি।
কয়রা সদর ইউনিয়নের ১ নম্বর কয়রা গ্রামে সুশীল মণ্ডলের বাড়ি থেকে হরি মন্দির পর্যন্ত রাস্তা গাইডওয়ালসহ উন্নয়নে কাবিখা-গম কর্মসূচির আওতায় ৭ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সরেজমিন দেখা যায়, সেখানে কয়েক বস্তা বালু ছাড়া আর কিছুই নেই। স্থানীয়দের মতে, সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকার মতো কাজ হয়েছে। প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান কোহিনূর শ্রমিক সংকটের কথা বলে শিগগির কাজ শেষ করার আশ্বাস দেন।
৫ নম্বর কয়রায় খায়রুন্নেসার বাড়ি থেকে রফিকুলের বাড়ি পর্যন্ত মাটি দ্বারা উন্নয়নে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে ২০-২৫ হাজার টাকার কাজ হয়েছে। মহারাজপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গাজী বাড়ি মোড় থেকে বাইতুস সালাম মসজিদ পর্যন্ত সড়কে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ২২০ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে কাজ হয়েছে আনুমানিক এক লাখ টাকার। একই ইউনিয়নের দেয়াড়া গ্রামে দুই লাখ টাকা বরাদ্দে ইটের সোলিং রাস্তা নির্মাণে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকার কাজ হয়েছে। উত্তর বেদকাশির দেওয়ানখালী খাল খননে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও মাত্র ৬ ঘণ্টা ভেকু মেশিন চালিয়ে ২৫-৩০ হাজার টাকার কাজ করা হয়েছে।
শুধু এসব নয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কয়রা উপজেলায় কাবিখা, কাবিটা ও টিআর কর্মসূচির আওতায় নেওয়া মোট ৬০৫টি প্রকল্পের অধিকাংশেই বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও সাইনবোর্ড নেই, কোথাও শ্রমিক দেখিয়ে ড্রেজার ও এক্সকাভেটর মেশিন ব্যবহার করা হয়েছে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার পাশাপাশি অবৈধভাবে ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলনের ফলে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, প্রতিটি প্রকল্প থেকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) ১০ শতাংশ এবং অফিস পিয়নকে ৪-৫ শতাংশ কমিশন দিতে হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মোট বরাদ্দের অন্তত ২০ শতাংশ টাকার প্রকল্প সরাসরি উপজেলা প্রশাসনের নামেও নেওয়া হয়েছে।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সদস্য সচিব সাইফুল ইসলাম বলেন, যখন তদারকি সংস্থাই কমিশন বাণিজ্যে জড়িত থাকে, তখন কাজের মান ভালো হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের একাংশ মিলে উন্নয়ন বরাদ্দ লুটপাট করছে।
এ বিষয়ে সদ্য যোগদান করা কয়রা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সবাইকে কাজ করতে হবে। যেসব প্রকল্পে কাজ শুরু হয়নি, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। কেউ গাফিলতি করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।