হোমনা (কুমিল্লা) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:১৪ পিএম
আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:১৫ পিএম
কবির ভাষায়"কারিগর গড়ে উষ্ণতার ঘর, শীতের হাওয়া মানে হার; ঘাম ঝরানো সুঁই-সুতোয়, কাটে আঁধার একাকার।" আকাশের কোণে হালকা কুয়াশা আর ভোরের শিশিরে মিশে আছে শীতের পরশ। প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনের সাথে সাথেই পাল্টে গেছে ধুনকর পাড়ার দৃশ্যপট।
এখন কারিগরদের নাওয়া-খাওয়ার ফুসরত নেই। চারদিকে শুধু তুলার ওড়াউড়ি আর ইলেকট্রনিক ধনুকের টংকার। হিমেল হাওয়ার দাপট যত বাড়ছে, কারিগরদের আঙিনায় ব্যস্ততার পারদ ততই উপরে উঠছে।
সুঁই-সুতার ছন্দে আগাম স্বপ্নের বুনন : ছবির দিকে তাকালে চোখে পড়ে এক নিবিড় একাগ্রতা। জরাজীর্ণ টিনের চালের নিচে দুই কারিগর যেন এক বিশাল লাল ক্যানভাসে ছবি আঁকছেন।
তাদের হাতের সুনিপুণ ছোঁয়ায় টকটকে লাল কাপড়ের ওপর সাদা সুতোর নকশা ফুটে উঠছে। প্রতিটি সুঁইয়ের ফোঁড় যেন এক একটি শান্তির ঘুম নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি।
তাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে শ্বেত-শুভ্র তুলা ও গার্মেন্ট ফাইবারের পাহাড় আর স্তূপীকৃত রঙিন লেপ, তোশক , বালিশ।
ধুলোবালি আর মিহি আঁশ নাকে-মুখে লাগলেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তাদের; কারণ এই দু'তিন মাসই তো তাদের সারা বছরের উপার্জনের প্রধান ঋতু।
ক্লান্তিহীন শ্রমে উষ্ণতার জোগান : শীতের এই সময়ে ধুনকরদের জীবন চলে ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে। সকাল থেকে শুরু করে নিঝুম রাত অবধি চলে তুলা ধুনাই আর সেলাইয়ের কাজ।
কখনো কখনো বৈদ্যুতিক আলোর নিচে কাজ চলে শেষ রাত পর্যন্ত। তুলা ধুনার সেই বিশেষ ছন্দময় শব্দ যেন পাড়ার নিস্তব্ধতা ভেঙে দেয়।
একজন কারিগর যখন নিবিষ্ট মনে লেপটি সেলাই করছেন, অন্যজন তখন পাশের গ্রাহকের অর্ডার বুঝিয়ে দিতে ব্যস্ত। তাদের এই ঘাম ঝরানো পরিশ্রমই সাধারণ মানুষের হিমশীতল রাতগুলোকে করে তোলে পরম আরামদায়ক।
ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় প্রশান্তির ঘুম : আধুনিক যুগে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অনেক কিছু বদলে গেলেও, মানুষের হাতে তৈরি এই লেপ-তোশকের কদর একটুও কমেনি। শিমুল তুলার সঙ্গে যোগ হয়েছে ফাইবার। তুলা, ফাইবার আর নতুন কাপড়ের সেই পুরোনো ঘ্রাণ বাঙালির কাছে এখনো পরম প্রিয়।
এই কারিগররা কেবল কাপড়ের সাথে তুলা মেশাচ্ছেন না, বরং তারা বুনছেন শীতের রুক্ষতাকে জয় করার সাহস। তাদের এই ব্যস্ততাই জানান দেয়, শীত জেঁকে বসেছে আমাদের জনপদে। তারা না থাকলে আমাদের শীতের রাতগুলো হয়তো কাটত চরম অস্বস্তিতে।
শীতের এই রাজকীয় প্রস্তুতি শেষে যখন ঘরে ঘরে নতুন লেপের ওম পৌঁছাবে, তখন হয়তো এই কারিগরদের শ্রমের কথা কেউ আলাদা করে মনে রাখবে না। কিন্তু তাদের হাতের প্রতিটি নিপুণ সেলাইয়ে মিশে থাকবে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তাই তো কবির ভাষায় বলা যায়।"কারিগর গড়ে উষ্ণতার ঘর, শীতের হাওয়া মানে হার; ঘাম ঝরানো সুঁই-সুতোয়, কাটে আঁধার একাকার।"
এই ধুনকররা কেবল পেশাজীবী নন, তারা আমাদের শীতের রাতের নিঃশব্দ এবং পরম এক বন্ধু।