কুমিল্লা ০২
জয়নাল সরকার, হোমনা (কুমিল্লা)
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:৪৮ পিএম
আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ২১:০৬ পিএম
কুমিল্লা-০২ সংসদীয় আসন হোমনা ও তিতাস উপজেলা নিয়ে গঠিত। এবারের জাতীয় নির্বাচনে এটি অন্যতম আলোচিত আসনে পরিণত হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ একাধিক রাজনৈতিক দল, পাশাপাশি কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর অংশগ্রহণে ভোটের মাঠ জটিল রূপ নিচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং স্থানীয়ভাবে শক্ত অবস্থানে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হোমনা উপজেলা বর্তমানে দলীয় কোন্দলে ভেঙে পড়েছে। হোমনা ও তিতাস দুই উপজেলাতেই বিএনপির প্রথম সারির নেতারা একাধিক ভাগে বিভক্ত। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে নির্বাচনী প্রস্তুতিতে।
‘বহিরাগত’ বিতর্কে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া কুমিল্লা-২ আসনের ভোটারদের কাছে এখনও পুরোপুরি পরিচিত ননÑ এমন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে মাঠে। তিনি মূলত কুমিল্লা-১ আসনের মেঘনা উপজেলার বাসিন্দা। এই বিষয়টিকে সামনে এনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ‘বহিরাগত’ ইস্যুতে প্রচারণা জোরদার করেছেন।
অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া বিএনপির মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেছেন, হোমনায় আমার জায়গা রয়েছে। আমি হোমনার। এ ছাড়াও বিএনপি একটি বড় দল। একটি রাজনৈতিক দলের অনেকেই মনোনয়ন প্রত্যাশা করে, এটাই স্বাভাবিক। এ নিয়ে মনোমালিন্য থাকতে পারে, মান-অভিমান থাকতে পারে, এগুলো থাকবে না। অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র অনেক প্রার্থীই থাকতে পারেÑ থাকবে। প্রতিযোগিতা না থাকলে তো আর এটার মর্যাদা থাকবে না।
হোমনা সদরের এক ভোটার আবদুছ ছালাম বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের এলাকার মানুষ সংসদে যাক। যিনি হোমনা ও তিতাসের মানুষের সুখ-দুঃখ বোঝেন, তাকেই ভোট দেবে মানুষ। বাইরের কাউকে হোমনার জনগণ ভোট দেয় না।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ঐক্য ও মাঠের দখল
বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক এপিএস ও অবসরপ্রাপ্ত সচিব ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মতিন খান এবং সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও হোমনা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. আজিজুর রহমান মোল্লা। সমর্থন দিয়ে তাদের সঙ্গে রয়েছেন হোমনার আরেক সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জহিরুল হক জহর। তারা সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ঐক্যের ঘোষণা দেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রাক্তন এপিএস ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মতিন খান বলেন, জনগণের দাবিতেই আমি নির্বাচন করছি। কুমিল্লা-২, হোমনা ও তিতাস উপজেলাতেই যোগ্য প্রার্থী রয়েছে। দল যদি এ আসনের কাউকে মনোনয়ন দিত তাহলে আমরা তাকেই মেনে নিতাম। হোমনা ও তিতাসের মানুষ অন্য আসনের অন্য উপজেলার ‘বহিরাগত’ কাউকে মনোনয়ন দেওয়ায় তা মেনে নিতে পারছে না। আমি হোমনা ও তিতাস উপজেলার মানুষের সেবক হতে চাই। আমাকে যদি মানুষ সে সুযোগ দেয় ইনশাল্লাহ তার মর্যাদা রক্ষা করব।
আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন সংগ্রহকারী উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান মোল্লা বলেন, দীর্ঘদিন মাঠে ছিলাম। মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে ছিলাম, আছি। দলীয় কোন্দলে সাধারণ মানুষ যেন বঞ্চিত না হয়, সেটাই আমার লক্ষ্য।’
তিতাস উপজেলার এক ভোটার রহমান বলেন, ‘হোমনা ও তিতাস থেকে যিনি নির্বাচন করবেন এবং মানুষের পাশে থাকেন তাকেই আমরা ভোট দেব।’
আসন পুনর্বিন্যাসে অনিশ্চয়তা
নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক পুনর্বিন্যাসে হোমনা ও তিতাস উপজেলাকে একত্রিত করে কুমিল্লা-০২ এবং মেঘনা উপজেলাকে দাউদকান্দির সঙ্গে যুক্ত করে কুমিল্লা-০১ গঠন করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করা হয়েছে, যা এখনও বিচারাধীন। অনেকের মতে, এই অনিশ্চয়তা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
আওয়ামী লীগ ভোট ব্যাংক ও অন্যান্য দল
১৭ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। এবার আওয়ামী জোটের শরিক জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্যও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। স্থানীয়দের ধারণা, আওয়ামী লীগসমর্থিত ভোটাররা নিজেদের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীর দিকে ঝুঁকতে পারেন।
এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা দলগুলো প্রার্থী দিলেও বড় ভোট ব্যাংক নেই বলে মতো স্থানীয়দের।
এক প্রবীণ ভোটার বললেন, শেষ পর্যন্ত আমরা তাকেই ভোট দেব, যাকে সৎ, যোগ্য আর মানবিক মনে হবে।
সব মিলিয়ে কুমিল্লা-০২ আসনে বিএনপি বর্তমানে কিছুটা ব্যাকফুটে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় ও আত্মবিশ্বাসী। তবে বিএনপি একটি বড় দল হওয়ায় শেষ মুহূর্তে দলীয় নির্দেশনা ও সমঝোতা ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারে।