রাশিদুল ইসলাম রাশেদ, কুড়িগ্রাম
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:০৬ পিএম
আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:২৫ পিএম
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যাদেশ চলতি বন্যা মৌসুমে মার্চ-২০২৫ সালে ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে অস্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধ কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে মোটা অঙ্কের ঘুষ বাণিজ্যের বিনিময়ে নীরব পাউবো কর্তৃপক্ষ।
নিম্নমানের জিও ব্যাগ ব্যবহারের ফলে কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এ সমস্ত জিও ব্যাগ। কথায় আছেÑ নদী গিলে খাচ্ছে জনপদ। পাউবো গিলে খাচ্ছে সরকারি বাজেট। ফলে শুধু চলতি বন্যা মৌসুমে সরকারের প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা ব্যয়ে এসব প্রকল্প কাজে আসছে না। ভাঙনের শিকার নদী-তীরবর্তী মানুষের বাধার মুখে নামমাত্র নিম্নমানের জিও ব্যাগ বাতিল করলেও বৃহৎ কাজগুলোতে এসব জিও ব্যাগ নির্বিচারে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে পাউবো কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এতে প্রকল্পের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন কুড়িগ্রামে ভাঙনের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় চলতি বন্যা মৌসুমে অস্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধে জেলায় ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬ দশমিক ২০৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ১৩৩টি জরুরি কাজের জন্য ৭ লাখ ৮৪ হাজার জিও ব্যাগ ফেলানোর কাজ চলছে।
এসব জরুরি কাজের মধ্যে ১ নম্বর প্যাকেজের কাজ করছে মেসার্স ইউনাইটেড ব্রাদার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। রাজারহাট উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর ভাঙনের শিকার ঘড়িয়ালডাঙ্গা নাখেন্দা এলাকায় ৩৫০ মিটার ভাঙন প্রতিরোধে ৩১ হাজার ৫৫০টি জিও ব্যাগ ফেলানো হয়েছে। এই প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ৭৬ লাখ। নিম্নমানের কাজের কারণে এলাকাবাসীর বাধায় ৬০০১টি জিও ব্যাগ বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য হয় পাউবো। কাজ বাতিল করলেও ৫০ শতাংশ বিল উত্তোলন করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
৩৩ নম্বর প্যাকেজের জরুরি কাজটি করছি মেসার্স বেলাল কনস্ট্রাকশন। রাজারহাট উপজেলার কালিরহাট এলাকায় ১০০ মিটার জিও ব্যাগ ফেলার কাজ সত্তর শতাংশ সম্পন্নের কথা বললেও বাস্তবে এই প্রকল্পেও বরাদ্দকৃত ৫২ হাজার জিও ব্যাগের মধ্যে ২০৮৯টি জিও ব্যাগ বাতিল করা হয়েছে।
একই উপজেলার তিস্তার ভাঙনের শিকার চতুরা এলাকায় ৩২ নম্বর প্যাকেজের ২৬০ মিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন প্রতিরোধে কাজ করছে মেসার্স নির্মাতা কৌশলী। ১৮ হাজার ৭৫০টি জিও ব্যাগ ফেলানোর নির্দেশনা ছিল। কিন্তু এলাকাবাসীর তোপের মুখে জিও ব্যাগ মানহীনের অভিযোগে ৪ হাজার ২৯৩টি জি ব্যাগ বাতিল করে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ।
অপরদিকে ভাঙন প্রতিরোধে পিএসএফ প্রতিটি জিও ব্যাগে শূন্য দশমিক ৮ এফএম পুরুত্বের বালু এবং পিপি বস্তায় এক দশমিক শূন্য পুরুত্বের বালু ভরাটের নির্দেশনা থাকলেও একটিতেও অনুসরণ করা হয়নি।
ভাঙনকবলিত কালিরহাট এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হক বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে কাজ বাস্তবায়ন করেন। যাতে এলাকাবাসী কোনো প্রতিবাদ করতে না পারে। এতে নিম্নমানের দায়সার কাজ করেছে ঠিকাদারের লোকজন। সরকার যে উদ্দেশ্যে বরাদ্দ দিয়েছে তা আর কোনো কাজে আসছে না। পাউবোর বড় সাহেবরা এসে লোক দেখানো মিছামিছি পরিদর্শন করে যায়।’
ঘড়িয়ালডাঙ্গা নাকেন্দা এলাকার বদরুল মিয়া বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা নিম্নমানের কাজ সঠিক বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আমাদের বাধার কারণে অনেকবার জিও ব্যাগ বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। এলাকাবাসী বাধা না দিলে এগুলো চালিয়ে দিত। আমরা শুনেছি, কাজ না করলেও পাউবো ঠিকাদারকে বিল দিয়েছে। ঠিকাদার এখন আর কাজও করে না, এলাকাতেও আসেন না।’
সিনিয়র সাংবাদিক আল্লামা ইকবাল অনিক বলেন, ‘সরকার দারিদ্র্যপীড়িত কুড়িগ্রামে নদীভাঙন প্রতিরোধ ও নদী শাসনে শত শত কোটি বরাদ্দ দিলেও কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে এই বিপুল অর্থ জলে ফেলে দেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। তিস্তার ভাঙনে শুধু জিও ব্যাগ বা ব্লক ফেললেই সমাধান হবে না, এজন্য প্রয়োজন ড্রেজিং করে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা। তাহলে রক্ষা পাবে বসতভিটা ও হাজার হাজার একর ফসলি জমি।’
এ বিষয়ে কথা হলে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম জানান, ‘নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আমরা বলেছিÑ ভালো প্রতিষ্ঠান থেকে জিও ব্যাগ ক্রয় করতে। যে সমস্ত জিও ব্যাগ মানহীন তা ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। নিম্নমানের জিও ব্যাগ দিয়ে কাজ বাস্তবায়নের সুযোগ নেই।’