ফটিকছড়ি
ওবাইদুল আকবর রুবেল, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:০৪ পিএম
আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:২৫ পিএম
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় রাত নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। দিনের আলোয় সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও সন্ধ্যার পর শুরু হয় পাহাড়-টিলা ও কৃষিজমির মাটি লুটের মহোৎসব। এক্সকাভেটরের বিকট শব্দে কেটে ফেলা হচ্ছে উঁচু টিলা, ডাম্প ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে উর্বর মাটি। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলা দিলেও মাটিখেকোরা থামছে না।
জানা গেছে, উপজেলার পাইন্দং, ভূজপুর, নারায়ণহাট, দাঁতমারা, বাগানবাজার, সুয়াবিল, হারুয়ালছড়ি ও কাঞ্চন নগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় অনেক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে পুঁজি করে এসব মাটিখেকো চক্র দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তারা দিনে আত্মগোপনে থাকলেও সন্ধ্যা নামলেই পাহাড় ও কৃষিজমির মাটি কাটা শুরু করে আর ভোর হলেই বন্ধ করে দেয়।
মাটিখেকোদের হুমকির মুখে পড়ছে ফসল উৎপাদন। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। দিনে অভিযান জোরদার হওয়ায় কৌশল বদলে রাতের আঁধারে মাটি কাটছে মাটিখেকো চক্রগুলো।
প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অন্তত অর্ধশতাধিক সিন্ডিকেট এক্সকাভেটর দিয়ে কৃষিজমির মাটি কেটে ডাম্প ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে তা ইটভাটা, পুকুর, ডোবা ও নতুন ভবন নির্মাণস্থলে বেচছে।
সরেজমিন গত শনি ও গতকাল রবিবার পাইন্দং, ভূজপুর ও বাগানবাজার ইউনিয়নের একাধিক এলাকা ঘুরে দেখা যায় পরিবেশ ধ্বংসের ভয়াবহ চিত্র।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উপজেলার পাইন্দং, ভূজপুর, নারায়ণহাট, দাঁতমারা, বাগানবাজার, সুয়াবিল, হারুয়ালছড়ি ও কাঞ্চন নগর ইউনিয়নে সক্রিয় রয়েছে সর্বদলীয় শক্তিশালী মাটিখেকো সিন্ডিকেটগুলো।
রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এসব চক্র দিনে লুকিয়ে থাকে। রাতের আঁধারে পাহাড় ও কৃষিজমি কাটা শুরু করে।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, প্রশাসনের অভিযানের সময়সূচি সম্পর্কে আগাম খবর পেয়ে যায় মাটিখেকোরা। ফলে কৌশল বদলে রাতে অবৈধভাবে মাটি কাটা হচ্ছে নিয়মিত। পাইন্দং ইউনিয়নের ফকিরাচাঁন আমতলা এলাকায় রাতের আঁধারে কয়েকটি এক্সকাভেটর দিয়ে কৃষিজমির মাটি কাটা হচ্ছে।
ভূজপুর ইউনিয়নের আন্ধারমানিক গলাচিপা এলাকায় স্থানীয় রাশেদের নেতৃত্বে ৪-৫ জনের একটি সিন্ডিকেট বিশালাকার একটি টিলা কেটে সাবাড় করেছে। এসব মাটি ডাম্প ট্রাকে করে নেওয়া হচ্ছে কাজীরহাট বাজারসংলগ্ন বিভিন্ন কৃষিজমি ভরাটের কাজে।
একইভাবে হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের আপন ব্রিকফিল্ড সংলগ্ন বাংলাবাজার সরকার বাড়ি এলাকায় কাটা হয়েছে টিলা। ভূজপুর ইউনিয়নের আছিয়া চা বাগান সংলগ্ন মা আমেনা লেয়ার ফার্মের পাশে আরিফ নামে এক ব্যক্তির মুরগির ফার্ম নির্মাণের জন্য কেটে ফেলা হয়েছে উঁচু টিলা। বাগানবাজার ইউনিয়নের লালমাই এলাকায় দিনেদুপুরেই ভবন নির্মাণের জন্য পাহাড়-টিলা কাটা হচ্ছে। লালমাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের একটি টিলা কাটার বিষয়ে ব্যবসায়ী হাসেমের ছেলে মাহবুব বলেন, যারা মাটি কেটেছে তারা জানিয়েছেন প্রশাসনের অনুমতি আছে। তবে কার কাছ থেকে কিংবা কী ধরনের অনুমতি নেওয়া হয়েছেÑ সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি।
এ ছাড়া বাগমারা এলাকায় মাহবুবুল হকের বসত টিলা, গার্ডের দোকান এলাকায় নবী মাস্টারের টিলা এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান একরামুল হক বাবুলের ভাই লায়েসের নেতৃত্বে কৃষিজমি কাটার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা বাধা দিলে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও লায়েস এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
লালমাই এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বলেন, যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারাই পাহাড় কাটে। মাটিখেকোরা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করলে বিপদে পড়তে হয়। তাই সবাই নীরব।
চট্টগ্রাম জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের রিসার্চ কর্মকর্তা আশরাফ উদ্দিন বলেন, মাটি কাটার স্থানগুলো পরিদর্শন করে শিগগিরই জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নজরুল ইসলাম বলেন, মাটি কাটার সংবাদ পেলেই রাত-দিন নির্বিশেষে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। টিলা-পাহাড় ও কৃষিজমির মাটি কাটা অপরাধ। প্রয়োজনে পুলিশ প্রশাসন নিজে থেকেই ব্যবস্থা নিতে পারে।