যশোর
তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ২১:৪৯ পিএম
যশোর অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক উন্নয়ন ও সংস্কার কাজে আবারও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গত তিন বছরে প্রায় ৬২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে যশোরের সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কার করা হলেও অতি নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণে ছয় মাসের মধ্যেই সড়ক ভেঙে পড়তে শুরু করে।
বর্তমানে সড়কের অবস্থা এতটাই বেহাল যে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের নামে আবারও নিম্নমানের ইট ও সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন চালকরা। তাদের আরও অভিযোগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগের কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে চলছে সরকারি অর্থ লুটপাট, যার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ ও পরিবহন খাত।
সড়কের ক্ষত সারাতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) নতুন করে সংস্কার কাজ শুরু করলেও সেখানেও একই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোতে নিম্নমানের ইটের সলিং দেওয়া হয়, যা অল্প সময়েই আবার নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে সৃষ্ট ক্ষত ঢাকতে নীলফামারীর মো. হামিদুল ইসলাম নামে এক ঠিকাদারের কাছ থেকে মাগুরার লাভলুর মাধ্যমে দেড় লাখ নিম্নমানের ইট ক্রয় করা হয়েছে। এসব ইটের মূল্য ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ৪৫ হাজার ৩১৬ টাকা। ইটগুলো বর্তমানে যশোর আশ্রম মোড়ের সওজ অফিসে সারিবদ্ধভাবে রাখা রয়েছে।
এদিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের অর্থায়নে যশোর-অভয়নগর সড়কে সংস্কার কাজ শুরু হলেও রূপদিয়া-বসুন্দিয়া এলাকায় কার্পেটিং তুলে ময়লাযুক্ত বালি ও নিম্নমানের ইট দিয়ে কাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়ক বিভাগের কিছু প্রকৌশলীর যোগসাজশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করছে। এক জেলার ঠিকাদার অন্য জেলায় কাজ করা, প্রভাবশালীদের চাঁদা প্রদান এবং একজনের কাজ অন্যজনের মাধ্যমে করানোর ফলে প্রকল্পগুলো কেবল নামেই টিকে আছে।
পরিবহন চালক নজরুল ইসলাম বলেন, যশোর-খুলনা, যশোর-ঝিনাইদহ, যশোর-নড়াইল, যশোর-বেনাপোলসহ একাধিক সড়ক উন্নয়নের নামে আগে সরকারি টাকা লুটপাট হয়েছে। এখন আবার সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিন শত শত গাড়ি চলাচল করে এমন সড়কে দুই-তিন নম্বর ইট দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
রূপদিয়ার ব্যবসায়ী বাবু অভিযোগ করে বলেন, সড়ক নির্মাণের সময় পুরাতন ইট ভেঙে খোয়া বানিয়ে আবার ব্যবহার করা হয় এবং নিম্নমানের বিটুমিন দেওয়া হয়। ফলে ছয় মাসের মধ্যেই সড়ক নষ্ট হয়ে যায়। এখন ভারী ট্রাক চলাচলের সঙ্গে সঙ্গে নতুন দেওয়া ইটও ধুলায় পরিণত হচ্ছে।
খাজুরার বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, সড়ক বিভাগের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে মেনটেন্যান্সের কাজ করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
নিম্নমানের ইট ব্যবহারের বিষয়ে ঠিকাদার লাভলু বলেন, ‘ওখানে দেড় লাখ ইট রয়েছে। তার ভেতরে সবই তো খারাপ না, কিছুটা ভালো আছে। এখানে কাজ করতে এসে স্থানীয় প্রভাবশালীদের নানা বাধার কারণে এটা করতে হয়েছে। এরপরেও যদি প্রেশার করা হয়, তাহলে আমি ইট তুলে নিয়ে চলে যাব, এখানে কাজই করব না।’
তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী শাহজাদা ফিরোজ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, সবকিছু নির্বাহী প্রকৌশলী জানেন।
সড়ক জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া বলেন, তিনি ইটগুলো দেখে পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং সংস্কার কাজে ওই ইট ব্যবহার করা হবে না। তবে ইটগুলো কেন এখনও রাখা হয়েছেÑ এ বিষয়ে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের মে মাসে যশোর-খুলনা মহাসড়ক উন্নয়ন কাজ শুরু হয়ে ২০২২ সালের শুরুতে শেষ হয়। ৩৮ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নে ব্যয় হয় ৩২১ কোটি টাকা। ২৭ কিলোমিটার কাজ সম্পন্ন করেছিলেন পতিত সরকারের ঘনিষ্ঠজন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব অ্যান্ড ব্রাদার্স, তমা কনস্ট্রাশন অ্যান্ড কোং। কাজ শেষের এক মাসের মধ্যেই সড়কের ৮ কিলোমিটার অংশ ফুলেফেঁপে ওঠে এবং পরবর্তীতে পুরো সড়কজুড়েই ভাঙন দেখা দেয়Ñ যার ভোগান্তি আজও পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।