কুমিল্লা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ০০:০৯ এএম
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নীলা। ঘন ঘন পানিবাহিত বিভিন্ন অসুখে আক্রান্ত হয়ে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারত না। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলিজিয়েট স্কুলের শিক্ষার্থী নীলা ক্রমেই অন্য সহপাঠীদের থেকে পিছিয়ে পড়তে থাকে। শুধু নীলা নয়, স্কুলের অন্য অনেক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি যখন ধীরে ধীরে কমে আসতে শুরু করে তখন শিক্ষকরা এর কারণ খুঁজতে শুরু করেন। তারা দেখেন, স্কুলে যে খাবার পানি সেটি নিরাপদ নয়।
নিরাপদ খাবার পানির ব্যবস্থা করতে স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ অন্যরা শুরু করেন দৌড়ঝাঁপ। যখন কিছুতেই কোনো কূল পাচ্ছিলেন না তখন সেই স্কুলে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করে দেয় দ্য কোকা-কোলা ফাউন্ডেশন ও ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন ফর দ্য আরবান পপুলেশন (টিসিসিএফ-ডাব্লিউএসইউপি)।
তাদের উদ্যেগে স্কুলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য খাবার পানির আর/ও ফিল্টার এবং হাত ধোয়ার জন্য ট্যাপ স্থাপন করা হয়। বসানো হয় সাবমার্সিবল পাম্প এবং পানির ট্যাংকি। নিরাপদ খাবার পানি পেয়ে নীলার মতো অন্য শিক্ষার্থীরা খুশি। তারা এখন নিয়মিত স্কুলে যায়। এমনকি স্কুলটিতে এখন আগের চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী।
টিসিসিএফ এবং ডাব্লিউএসইউপি কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ভিক্টোরিয়া কলিজিয়েট স্কুলের মতো এমন অনেক স্কুলে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে আর/ও ফিল্টার স্থাপন করেছে। পাশাপাশি এসবের রক্ষণাবেক্ষণ এবং সময়মতো ফিল্টার কিট পরিবর্তনের জন্য শিক্ষার্থীরা মিলে একটি কমিটি করেছে। তারাই একটি খাতায় দিন-তারিখ লিখে রেখে সময় মতো ফিল্টার বদল করে।
নীলা জানায়, সেসহ তার অনেক সহপাঠী একসময় নিরাপদ পানির অভাবে স্কুলে নিয়মিত ছিল না। এখন সবাই নিয়মিত স্কুলে আসে। এমনকি এখন তাদের স্কুলে আগের চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্কুলে প্রবেশের পর বাম দিকে শিক্ষকদের কক্ষে রয়েছে একটি ফিল্টার। সেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে সামনে এগোলে সুন্দর পরিপাটি স্থানে পানির ফিল্টারটি চোখে পড়বে। একই সঙ্গে সেখান চারটি ট্যাপে শিক্ষার্থীদের হাত ধোয়া থেকে নিয়মিত কাজের পানি সরবরাহ করার ব্যবস্থা রয়েছে।

সেই পানির ফিল্টার পয়েন্টের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হয় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলিজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা (ইনচার্জ) আয়েশা খাতুনসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। আয়েশা খাতুন বলেন, স্কুলে টিফিনের সময় অর্ধেক শিক্ষার্থী বাসায় চলে যেত নিরাপদ পানির অভাবে। খাবার পানি, হাতমুখ ধোয়া সবকিছুর জন্যই জরুরি ছিল পানি। এই ফিল্টার স্থাপনের পর থেকে স্কুলের পরিবেশ বদলে গেছে। এখন ৩৬৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। যা আগের চেয়ে বেশি।
টিসিসিএফ এবং ডাব্লিউএসইউপি-কে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পানি যে কতটা জরুরি সেটা এখন আমরা খুব ভালোভাবে টের পাই। অভিভাবকরাও এতে খুব খুশি।
স্কুলের শিক্ষার্থীদের টিসিসিএফ এবং ডাব্লিউএসইউপি সঠিকভাবে হাত ধোয়ার প্রশিক্ষণও দিয়েছে। স্কুলের শিক্ষার্থী ঊর্মিলা আক্তার মীম সবাইকে হাত ধোয়ার সঠিক পদ্ধতি দেখিয়ে দেয়।
সে জানায়, তারা এক সময় নিরাপদ পানির অভাবে নানান সমস্যায় থাকত। এখন সেটি নেই। এমনকি তারা সঠিকভাবে হাত ধোয়া ও পানির ব্যবহার নিয়েও প্রশিক্ষণ পেয়েছে।
ডাব্লিউএসইউপি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার উত্তম কুমার সাহা বলেন, ‘আমাদের স্থাপিত পানি–পয়েন্ট ও আর/ও ফিল্টার শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো, উপস্থিতি বাড়ানো এবং অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্কুলে এখন নির্ভরযোগ্যভাবে নিরাপদ পানি পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ কমেছে এবং ক্লাস চলাকালীন সময়েই স্কুল ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে স্কুলের পরিবেশ আরও স্বস্তিদায়ক ও সহায়ক হয়ে উঠেছে।’
স্কুলের পাশাপাশি কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের বেশ কিছু নিম্ন আয় জনগোষ্ঠী বসবাসকারী এলাকায় পানি পয়েন্ট করে দিয়েছে টিসিসিএফ এবং ডাব্লিউএসইউপি। এসব এলাকায় এখন কয়েকশ পরিবার নিরাপদ পানি পাচ্ছে এবং জীবনমানের উন্নতি হয়েছে।