তানভীর হাসান
প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৯:৪৭ এএম
আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:০৭ এএম
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট কিলিংয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বানচালের। এজন্য অন্তত দেড়শ প্রশিক্ষিত ক্যাডার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এসব ক্যাডারের নেতা হচ্ছেন দুবাইতে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও কারাগারে আটক সুব্রত বাইন। তারাই কারাগারে ও দুবাইতে বসে পাশের একটি রাষ্ট্র ও দেশের একটি রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে কাজ করে যাচ্ছেন। আর দেশে বসেই এসব প্রশিক্ষিত ক্যাডারকে দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছিলেন সুব্রত বাইনের মেয়ে সিনথিয়া বীথি। এমনকি হাদি হত্যাচেষ্টায়ও তার যোগসূত্র মিলছে।
বিষয়টি সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার
পক্ষ থেকে জানানোর পর গত সোমবার রাতে বাইনকন্যাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
এরপর তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসে নাশকতাসহ দেশবিরোধী নানা কর্মকাণ্ডের
ব্লু-প্রিন্ট। গতকাল তাকে কঠোর গোপনীয়তায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর
করা হয়। পরে গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে রিমান্ডের আবেদন করে আদালতে হাজির করা হলে
তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। যদিও তাকে সরাসরি হাদি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার না দেখিয়ে
হাতিরঝিলের আরিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে র্যব-১১-এর
সিইও লে. কর্নেল এইচএম সাজ্জাত হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পুলিশের বিশেষ শাখার
(এসবি) অনুরোধের প্রেক্ষিতে তাকে (বাইনকন্যা) কুমিল্লা থেকে হেফাজতে নিয়ে ঢাকা মহানগর
গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
জানা গেছে, শীর্ষ
সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের কন্যা সিনথিয়া বীথিকে সোমবার কুমিল্লা কারাগারের সামনে
থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। এরপর
তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এমনকি তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনসেট ও সঙ্গে থাকা অত্যাধুনিক
ডিভাইস জব্দ করে সেখানে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য পাওয়া যায়। পরে আলামতসহ তাকে গোয়েন্দা
পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে র্যাব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জয়েন্ট কমিশনার
মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সুব্রত বাইনের মেয়েকে গ্রেপ্তারের
পর র্যাবের পক্ষ থেকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাকে গতকাল ৭ দিনের রিমান্ডের
আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। এর আগে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ
করা হলে দেশে নির্বাচন বানচালের জন্য টার্গেট কিলিংয়ের তথ্যও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া হাদি
হত্যাচেষ্টা মামলায়ও তার সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জানা গেছে, গত
২৭ মে কুষ্টিয়া থেকে যৌথ বাহিনী শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী এবং
তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ ওরফে আবু রাসেল মাসুদকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের
দেওয়া তথ্যে রাজধানী থেকে সহযোগী শুটার আরাফাত ও শরীফকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর
তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এবং পরে নারায়ণগঞ্জ কারাগারে রাখা হয়। সেখান থেকে গত ৫ ডিসেম্বর দুপুরে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
এরপর থেকে তিনি কুমিল্লা কারাগারে অবস্থান করছিলেন। সেখানে বসেই তিনি গোপন চিরকুটের
মাধ্যমে মেয়ে সিনথিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিলেন। বিষয়টি গোয়েন্দাদের নজরে এলে তারা
সিনথিয়ার ওপর নজরদারি চালাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে দেখা যায়, ঢাকায় সুব্রত বাইনের ক্যাডারদের
নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে তার হাতে চলে এসেছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডে গ্যাং মাদার হিসেবে তার পরিচিতি
বাড়তে থাকে। এর সাথে যোগ হয় দুবাইতে পলাতক অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ক্যাডাররাও।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই গ্রেপ্তার কেবল একটি
সন্ত্রাসী পরিবারের সদস্যকে আইনের আওতায় আনার ঘটনা নয়; বরং
এটি দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ, আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসী যোগসূত্র
এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে অপরাধ জগতের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার জন্যও
গুরুত্বপূর্ণ ।
পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্রমতে,
সুব্রত বাইন ৫ আগস্টের পর গোপন বন্দিশালা থেকে মুক্তির পর ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে
তার সঙ্গে সম্পর্ক হয় সেদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য ও আওয়ামী লীগের পলাতক শীর্ষ
নেতাদের। এরই মাঝে দেশে অবস্থান করা তার ক্যাডাররাও সেখানে গিয়ে বাইনের সঙ্গে দেখা
করেন। এ ছাড়া ভারতে পলাতক বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের অন্য ক্যাডাররাও বাইনের দলে যোগ
দেন। নেপথ্যে কাজ করেন ওই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। পরবর্তীতে এসব ক্যাডারকে
প্রশিক্ষিত করে দেশে পাঠানো হয়। উদ্দেশ্য গুপ্ত হত্যা করে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা।
বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে বাইনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর নতুন পথ খুঁজতে থাকেন চক্রান্তকারীরা।
তারা বাইনের মেয়েকে সামনে নিয়ে আসেন। একই সঙ্গে যোগাযোগ করে দলে ভেড়ান অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী
জিসানকে। একপর্যায়ে সিনথিয়া ও জিসান দুজনই চুক্তিতে যেকোনো অপকর্ম করতে চক্রান্তকারীদের
সঙ্গে হাত মেলান। প্রথম টেস্ট হিসেবে শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার
দায়িত্ব দেওয়া হয় আদাবরের ছাত্রলীগ নেতা দাউদ ও আলমগীরকে। তারা দুজনই বাইনের ক্যাডার
হিসেবে পরিচিত। ব্যাকআপ হিসেবে রাখা হয় জিসানের ক্যাডারদের। সীমান্ত পারাপারের দায়িত্বে
ছিলেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। নিখুঁত প্ল্যানে কাজ শেষে তারা দেশ ছেড়ে পালাতে
পারেন বলে গোয়েন্দাদের ধারণা।
একটি সূত্রমতে, কারাগারে বসে সবকিছুই
খবর রাখছিলেন সুব্রত বাইন। সোমবার সে বিষয়ে আপডেট জানাতে ও পরবর্তী করণীয় বিষয়ে কুমিল্লা
কারাগারে বাবার সাথে দেখা করতে যান সিনথিয়া বীথি। কিন্তু বিষয়টি জরুরি হয়ে পড়ায় তাৎক্ষণিক
এসবির অনুরোধে দ্রুতই তাকে তুলে নেয় র্যাব। পরে গতকাল সকালে তাকে গোয়েন্দা পুলিশের
কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদে তার মুখ থেকে গুপ্ত হত্যার বিষয়ে অনেক
তথ্য বেরিয়ে আসে।
পুলিশ ও গোয়েন্দাদের উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজধানী
ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সক্রিয় সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র, বিদেশিদের সঙ্গে
যোগাযোগ এবং প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে লেনদেনÑ এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া
যেতে পারে তার কাছ থেকে। প্রাথমিকভাবে র্যাব তার নিয়ন্ত্রণে থাকা অস্ত্রভান্ডার, কিলার
টিম এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা করছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা
গেছে, সিনথিয়া বীথি তার বাবার অনুপস্থিতিতে অত্যন্ত কৌশলে পুরো নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ
নিজের হাতে তুলে নেন। অভিযোগ রয়েছে, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ
অর্থ লেনদেনসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি।
তার ডিজিটাল ডিভাইস ও কলরেকর্ড বিশ্লেষণ করে এসব বিষয়ে
বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ভারতে পলাতক কিছু
বাংলাদেশি রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল কি
না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জানা গেছে, বীথি সুব্রত বাইনের তিন
স্ত্রীর মধ্যে স্ত্রী লুসির বড় সন্তান। তার ভাইয়ের নাম তৌকির আলী রিপন।