সুদানে নিহত ৬ সেনাসদস্য
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:২৬ পিএম
আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:৩৯ পিএম
সুদানের আবেই অঞ্চলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের একটি ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের নৃশংস হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয়জন শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন। দূর আফ্রিকার মাটিতে তাঁদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে জাতিসংঘের শান্তির পতাকা। দেশে ফিরছে শোকের খবর, আর থমকে গেছে অনেক পরিবারের স্বাভাবিক জীবনের গতি।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রকাশিত নিহতদের তালিকায় রয়েছেন কর্পোরাল মো. মাসুদ রানা (নাটোর), সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম, বীর (কুড়িগ্রাম), সৈনিক শামীম রেজা, বীর (রাজবাড়ী), সৈনিক শান্ত মন্ডল, বীর (কুড়িগ্রাম), মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (কিশোরগঞ্জ), লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া (গাইবান্ধা)। প্রতিবেদকদের পাঠানো খবর—
কুড়িগ্রামে থেমে গেছে জীবনের সব শব্দ
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সাটমাধাই ডারারপাড় গ্রামের বাসিন্দা নিহত সৈনিক শান্ত মন্ডল (২৬)। তার বাবা সাবেক সেনাসদস্য নুর ইসলাম মন্ডল আগেই মারা গেছেন। মা সাহেরা বেগম ছেলের শোকে বাকরুদ্ধ। শান্তর বড় ভাই সোহাগ মন্ডল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ল্যান্স করপোরাল হিসেবে কর্মরত।
রবিবার (১৪ ডিসেম্বর) দুপুরে শান্তর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা সাহেরা বেগম বিছানায় বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। চোখের জল ফুরিয়ে গেলেও বুকের ভেতর জমে আছে পাহাড়সম বেদনা।
শান্তর বড় ভাই সোহাগ মন্ডল বলেন, ২০১৮ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া শান্ত গত ৭ নভেম্বর সুদানে যান। এক বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়, স্ত্রী বর্তমানে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
একই জেলার উলিপুর উপজেলার পারুলেরপাড় গ্রামের সন্তান সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম (৩৮) মাত্র ৩৩ দিন আগে শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দেন। শনিবার বিকেলে পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছিলেন মমিনুল। সেটিই ছিল শেষ কথা। রাত ১১টার দিকে আসে মৃত্যুর খবর। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন স্ত্রী ও মা। মাত্র ৩৩ দিন আগে মমিনুল সুদানে শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দেন। স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তানকে রেখে তিনি শহীদ হন। বড় মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে, ছোটটির বয়স মাত্র চার বছর।
গাইবান্ধায় স্বপ্নভাঙার হাহাকার
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ছোট ভগনবানপুর গ্রামের সবুজ মিয়া (৩৫) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে লন্ড্রিম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১০ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়া সবুজ গত ৭ নভেম্বর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসেবে সুদানে যান। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পরিবারের প্রধান ভরসা। দেড় বছর আগে বিয়ে করেন সবুজ। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অকাল মৃত্যুতে গ্রামজুড়েই চলছে শোকের মাতম।
ছেলের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ মা সকিনা বেগম বলেন, ‘ও বলেছিল, মা আর একটু কষ্ট করো। আমি ফিরে এলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’ স্ত্রী নুপুর বেগম বলেন, ‘আমার জীবনের সব স্বপ্ন ওর সাথেই শেষ হয়ে গেল।’
কিশোরগঞ্জে পিতৃহারা তিন বছরের শিশু
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার তারাকান্দি গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম (৩০) প্রায় ১১ বছর ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। গত ৭ নভেম্বর মেস ওয়েটার পদে দায়িত্ব পালনরত জাহাঙ্গীর স্ত্রী ও তিন বছরের একমাত্র সন্তান ইরফানকে রেখে এক মাস আগে সুদানে যান। তার মৃত্যুর খবরে বাড়ির উঠোনজুড়ে এখন শুধু কান্না আর হাহাকার।
নিহতের বাবা হযরত আলী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, সে যাওয়ার সময় বলেছে তার ছেলেকে দেখে শুনে রাখি। আজ আমার ছেলেই নেই। স্ত্রী রুবাইয়া আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বার বার মুর্চা যাচ্ছেন।
রাজবাড়ীতে স্বপ্নভাঙা নবদম্পতির সংসার
রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার হোগলাডাঙ্গী গ্রামের সৈনিক শামীম রেজা ২০১৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দেড় বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়। সন্তান হওয়ার আগেই সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারান তিনি। নিহত সৈনিকের সদ্য নির্মিত একতলা বাড়ির ভেতরে শোকাহত মা ও স্ত্রী আহাজারিতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।
নিহত শামীম রেজার বাবা আলমগীর ফকির বলেন, ছেলেটার দেড় বছর আগে বিয়ে হয়েছে। এখনও কোনো সন্তান হয়নি। আজ আমার সব শেষ।
নাটোরে তিন ভাইয়ের পরিবারে শোক
নাটোরের লালপুর উপজেলার বোয়ালিয়াপাড়া গ্রামের কর্পোরাল মাসুদ রানা (৩০) ছিলেন তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। তিন ভাইই সেনাবাহিনীর সদস্য। প্রায় ১৯ বছরের চাকরি জীবনে দেশ ও জাতির সেবায় নিয়োজিত ছিলেন তিনি। সাহার উদ্দিনের ছেলে শহীদ মাসুদ রানা গত ৭ নভেম্বর স্ত্রী ও আট বছরের একমাত্র কন্যা মাগফিরাতুল মাওয়া আমিনাকে রেখে শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দিতে সুদানে যান।
শান্তি প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গ করা এই ছয় বীর সেনাসদস্যের আত্মত্যাগে গর্বিত দেশ। তবে তাঁদের পরিবারগুলোর ঘরে আজ শুধুই হাহাকার, নিঃশব্দ কান্না আর প্রিয়জনের মরদেহ ফেরার অপেক্ষা।