হোমনা (কুমিল্লা) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:৫৭ পিএম
কুমিল্লার হোমনা উপজেলার মহিষমারী গ্রাম। সেই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হাভাতিয়া নদীর কোল ঘেঁষা মাটির বাড়িটি যেন নদীবেষ্টিত এক নিরালা দ্বীপ! চারদিকে সবুজ, আর সেই সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত মায়াময় সংসার। কোথাও বকের পায়ের টুংটাং, কোথাও ঘুঘুর মৃদু ডাকাডাকি, শালিকের লাফালাফি, খরগোশের ছোটাছুটি, বিড়াল-কুকুরের নিশ্চিন্ত ঘুম। আর এই অদ্ভুত মায়াময় সংসারের কেন্দ্রবিন্দু একজন মানুষÑ মো. আবুল কাশেম ভূঁইয়া (৪৩)।
প্রতিদিন ভোরেই সেই বাড়িতে দেখা যায় অন্যরকম এক দৃশ্য। বকের মতো ডাক দেন কাশেম। মুহূর্তেই পুকুরের ওপাশ থেকে উড়ে আসে দুটো সাদা বক। কেউ তার কাঁধে বসে, কেউ হাতে, কখনও আবার দাঁড়ায় গা ঘেঁষে। হাতের ছোট পাত্র তুলে কাশেম যখন একমুঠো মাছ এগিয়ে দেনÑ পাখিগুলোর চোখে তখন খেলা করে অপার নির্ভরতা।
এই বক দুটি তিন মাস ধরে তার কাছে আছে। অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া পাখি দুটিকে সেবা-শুশ্রূষায় সুস্থ করে তুলেছেন তিনি। কাশেম বলেন, ‘আমি কোনো পাখিকে কখনও খাঁচায় রাখি না। অসুস্থ অবস্থায় পেলেই চিকিৎসা করি, আর সুস্থ হলেই ছেড়ে দিই মুক্ত আকাশে।’
তার ঘরজুড়ে রয়েছে খরগোশ, বিড়াল, কবুতর, দেশি হাঁস, এমনকি অসহায় পথকুকুরও। হোক অসুস্থ বা পরিত্যক্তÑ কাশেমের বাড়িতে সবার জন্যই রয়েছে নির্বিঘ্ন আশ্রয়। ঘরের দক্ষিণ জানালার পাশে আমগাছের ডালে নিশ্চিন্তে ডিমে তা দিচ্ছে একটি ঘুঘু; মানুষের ভয়ে সে সরে যায় নাÑ কারণ সে জানে, এই বাড়ির মানুষেরা প্রাণীর ক্ষতি করে না।
কাশেমের স্ত্রী নিলুফা বেগম স্থানীয় কাঁঠালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তাদের ছেলে নূরে আলম ভূঁইয়া নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী, মেয়ে নুসরাত জাহান খাদিজা পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে। তারাও কাশেমের এই নিঃস্বার্থ প্রাণীসেবায় সহযোগিতা করে। টিনের চালা দেওয়া মাটির মেঝের ঘর হলেও সেখানে অভাব নেই আনন্দের। অবসরে বসে দোতরা বা গিটার বাজান কাশেম, আধ্যাত্মিক গান গেয়ে সময় কাটান। তার মতে, যারা প্রাণীকে ভালোবাসে তারা কখনও একা থাকে না।
আশপাশ থেকে অনেকেই আসে পাখপাখালির সঙ্গে কাশেমের অদ্ভুত সখ্য দেখতে। তাদের ভাষায়Ñ ময়না বা টিয়া মানুষের ডাকে আসে বলে শুনেছি। কিন্তু বককে ডাকলে মানুষের কাছে আসÑ এ দৃশ্য প্রথম দেখলাম। স্থানীয় যুবক তাওহীদ বলেন, কাশেম ভাই ডাকলেই বকগুলো ছুটে আসে। দেখতে অপূর্ব লাগে।
কথায় কথায় কাশেম জানান, ১৯৯৩ সালের এক ঝড়ে বাড়ির পাশের মান্দার গাছ থেকে একটি পাখির বাসা পড়ে গেলে ছানাগুলোকে কেঁচো খাইয়ে বড় করেন তিনি। সেই থেকে পশু-পাখির সঙ্গে সখ্য বাড়তে থাকে তার।