তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ২১:৫৮ পিএম
উৎসবের মৌসুম ঘনিয়ে আসতেই নতুনরূপে সেজেছে ফুলের রাজধানী গদখালী। চারদিকে চোখ জুড়ানো রঙের উৎসব, বাতাসে তাজা ফুলের ম ম সুবাসÑ সব মিলিয়ে যেন এক প্রাণময় প্রস্তুতি চলছে। গাঁদা, গোলাপ থেকে শুরু করে জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকা বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সাজানো এই ফুলের রাজধানী এখন ব্যস্ত হয়ে উঠেছে সারা দেশে সরবরাহের অপেক্ষায়।
কিন্তু উৎপাদিত ফুলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে ফুলচাষিদের মাঝে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানুষের অর্থনৈতিক সংকটকে দায়ী করছেন ফুলচাষিরা। প্রতি বছর পাঁচ দিবস উপলক্ষে যশোর ঝিকরগাছা গদখালীতে শতকোটি টাকার ফুল বেচাকেনা হলেও এবার এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ফুলচাষিরা।
গদখালী ফুলের বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারের মহাসড়কের দুধারে ফুল বিক্রির জন্য বসে আছেন কৃষকরা। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে এসেছেন ফুল কিনতে। তবে অন্য বছরের মতো ফুলের দাম কম হওয়ায় চাষিরা লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
পানি সারা থেকে ফুল নিয়ে আসা মহিদুলের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার ফুলের দাম অনেক কম। দুই বছর আগেও একটি গোলাপ ফুল বিক্রি হয়েছে পাঁচ থেকে সাত টাকা। সেই ফুল এখন বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে তিন টাকায়। তেমনি আগে জারবেরা বিক্রি হতো ১৮ থেকে ২২ টাকায় এখন বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ৯ টাকায়। এভাবে প্রতিটি ফুলের দাম কমে গেছে। যে কারণে এবার ফুলচাষিরা ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
গদখালীর ফুলচাষি আব্দুর রহিম বলেন, গদখালীসহ যশোরাঞ্চলে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে নানা জাতের ফুলের চাষ হয়। এই ফুল চাষ ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার মানুষ। ফুল চাষে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এলাকার কয়েক হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে।
ফুলচাষি নজরুল ইসলাম বলেন, শুধু গদখালী নয়, আশপাশের আরও কয়েকটি ইউনিয়ন এবং উপজেলাতেও গ্রামে গ্রামে ফুল চাষের বিপ্লব ঘটেছে। এই অঞ্চলে ছয় হাজারের বেশি চাষি দেড় হাজার হেক্টর জমিতে ফুল চাষ করছেন। এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রথম ফুল চাষ শুরু করেছিলেন পানিসারা গ্রামের কৃষক শের আলী সরদার। তিনি ১৯৮২ সালে এক বিঘা জমিতে রজনিগন্ধা ফুল চাষ করেছিলেন। তার সফলতা দেখে পরবর্তীতে ধান, পাট কিংবা প্রচলিত শস্য চাষ ছেড়ে এলাকার চাষিরা ঝুঁকে পড়েন ফুল চাষে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে এ অঞ্চলে ফুল চাষে বিপ্লব ঘটেছে।
ফুল ব্যবসায়ী মিলন জানান, মহান বিজয় দিবস, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও বসন্তবরণ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বাংলা নববর্ষবরণসহ ইংরেজি নববর্ষের মতো দিনগুলোতে ফুলের চাহিদা বাড়ে। বেচাকেনাও বেড়ে যায়। এই দিবসগুলো ঘিরে বাজার ধরতে ব্যস্ততা বেড়েছে ফুলচাষিদের। তবে ফুলের দাম কম হওয়ায় কৃষকরা লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
গদখালী পানিসারা ফুল চাষি ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি ইসমাইল হোসেন বলেন, আমরা এর আগে যে দামে ফুল বিক্রি করেছি, বর্তমানে তার প্রায় অর্ধেক দামে ফুল বিক্রি করতে হচ্ছে। প্রতি বছর এসব উৎসবে গদখালী বাজারে প্রায় শত কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়। তবে এবছর দাম কম হওয়ার কারণে টার্গেট পূরণে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নূরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ ফুল ঝিকরগাছার গদখালীতে উৎপাদন হয়। মৌসুম এলেই সারা দেশের ব্যবসায়ীরা গদখালীতে ফুল কিনতে আসেন। এ ছাড়া এখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে ফুল বাগান দেখতে গাড়ি ভরে মানুষজন আসে। ফলে এলাকার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। তবে ফুলের দাম কম হলেও কিছুদিনের ভেতরে দাম বাড়তে পারে। ফুলচাষিদের ঝিকরগাছা কৃষি অফিস থেকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করা হয় বলে তিনি জানান।