ফসিয়ার রহমান, পাইকগাছা (খুলনা)
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:৫৫ পিএম
মাজেদা খানম ডালিম। প্রবা ফটো
রত্নগর্ভ- শব্দটি আজকাল বহু আলোচনায় আসে। কিন্তু সন্তান জন্মালেই রত্ন হয় না। সুযোগ–সুবিধাহীন পরিবেশে সন্তানকে মানুষ করে তোলার যে নিরব, দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রাম—সেখানেই প্রকৃত রত্নগর্ভতার পরিচয়। খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লস্কর গ্রামের মাজেদা খানম ডালিম সেই নিরব সংগ্রামের এক উজ্জ্বল নাম।
থানা সদর থেকে চার কিলোমিটার দূরের জঙ্গলাকীর্ণ লস্কর গ্রাম। মাঝখানে খরস্রোতা নদী- যে পথকে করত আরও কঠিন। বিদ্যুৎ এসেছে দুই হাজার সালের পর। সেই গ্রামে ১৯৬২ সালে বধূ হয়ে আসেন ডালিম। শৈশবে পড়াশোনার সুযোগ পাননি তিনি। পঞ্চম শ্রেণির পর পড়া বন্ধ হলেও পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসা হারাননি কখনো। বিয়ের পরই নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন- সব সন্তানকে অন্তত স্নাতক করাবেন।
স্বামী মো. মনসুর আলী গাজী ছিলেন দরিদ্র মানুষের ডাক্তার। সরকারি চাকরির সুযোগ ছেড়ে তিনি গ্রামেই থেকে মানুষের সেবা বেছে নেন। সেই সেবার জীবনে ডালিম ছিলেন নীরব শক্তি। আট সন্তান- সবাই বড় হয়েছে হারিকেনের আলোয়। সন্ধ্যার পর গাঢ় অন্ধকারে পড়তে বসতেন তারা। ভয়ের সেই সময়ে মা–বাবা পাশে বসে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। নিয়ম ছিল কঠোর, কিন্তু ভালোবাসায় মোড়া- মাগরিবের আজানের সঙ্গে দরজা বন্ধ, নামাজ শেষে পড়া, রাত তিনটায় উঠে আবার পড়া।
ডালিমের দিন কাটত রান্নাঘর, সংসার আর সন্তানদের পড়াশোনার তদারকিতে। তবু বই পড়া ছাড়েননি কখনো। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বেগম রোকেয়া- তার পাঠজগৎ ছিল বিস্তৃত। রেডিওতে নাটক শোনার সুযোগ করে দিতেন সন্তানদের।
এই ত্যাগের ফল মিলেছে। আট সন্তানের সবাই উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। কেউ শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক, কেউ আইনজীবী, কেউ গবেষক- দেশে ও দেশের বাইরে। আজ ডালিম লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটেন। কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারেন না। কিন্তু সন্তানের সাফল্যই তার শক্তি, তার শান্তি।
লস্কর গ্রামের অসংখ্য মানুষ আজও স্মরণ করেন- ডালিম শুধু এক সন্তানের মা নন, তিনি মানুষের কষ্ট ভাগ করে নেওয়া এক মানবিক মুখ। নিরবে ত্যাগ করে যে আলো জ্বালানো যায়- পাইকগাছার ডালিম তারই প্রমাণ।