মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৫৮ পিএম
নারী জাগরণের অগ্রদূত মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার স্মরণে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ এলাকায় বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে আয়োজিত জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তিনদিনের মেলায় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় সিন্ডিকেট দোকান বরাদ্দ নিয়ে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করে কয়েক লক্ষ টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার (১০ ডিসেম্বর) বিকালে পায়রাবন্দ মেলার একাধিক স্টল ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বললে প্রতিবেদককে স্টল বরাদ্দের নামে জিম্মী করে অতিরিক্ত পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা। এদিকে মেলায় ক্রেতা কম হওয়ায় লোকসানের আশংকায় হতাশায় ভুগছেন মেলায় আগত ব্যবসায়ীরা।
অভিযোগে জানা যায়, গত ৮ ডিসেম্বর মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের উপস্থিতিতে মেলার জন্য ব্যবসায়ীদের ৩৬৫টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রত্যেকটি ৫ ফিট আয়তনের দোকান ২৫০০ টাকায় বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসময় ব্যবসায়ী সেজে স্থানীয় বিএনপি, ছাত্রদল, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা অধিকাংশ দোকান নিজের নামে বরাদ্দ নেন। পরে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছে একেকটি দোকান পাঁচ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। এছাড়াও বিদ্যুৎ বিলের নাম করে প্রত্যেক দোকান থেকে গত ৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ১০০ টাকা করে তোলা করা হলেও এ বিষয়ে প্রশাসন কিছুই জানে না।
মেলার কার্যক্রমে জড়িত একাধিক ব্যক্তি জানান, ইউএনও অফিস ও ইউনিয়ন পরিষদের একাধিক কর্মকর্তা কর্মচারী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের যোগসাজশে প্রতিবছরেই লক্ষ লক্ষ টাকার চাঁদাবাজি সংঘটিত হয়ে থাকে। এবছর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কঠোর তদারকি ঠেকাতে পারেনি এই চাঁদাবাজি।
সরেজমিনে মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার স্মরণে আয়োজিত মেলার পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি সরকারি ডিগ্রি মহাবিদ্যালয় মাঠে গিয়ে দেখা যায়, মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম ও পায়রাবন্দ ইউপি সচিব শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বে গ্রাম পুলিশসহ অবৈধভাবে স্থাপন করা দোকানগুলোতে বরাদ্দের নির্ধারিত ২৫০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। এসময় গোবিন্দগঞ্জ থেকে আসা ব্যবসায়ী সাকিরুল ইসলামের কাছে প্রতিবেদক বরাদ্দের কাগজ দেখতে চাইলে ইউপি সচিব শাহাদাত বলেন, ‘এটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্রের নামে বরাদ্দ। এটার হিসেব আমরা করবো না।’ গণমাধ্যমকর্মী পরিচয় দেওয়ার পরে ব্যবসায়ী সাকিরুল বলেন, ‘১০০০ টাকা ইউনিয়ন পরিষদের ফিরোজ ও মাসুদের হাতে দিয়েছি।’ তড়িঘড়ি করে ইউপি সচিব ছুটে এসে ৬২ নম্বর টোলের একটি কাগজ দেখিয়ে বলেন, ‘এটি নিয়ম অনুযায়ী বরাদ্দ হয়েছে।’
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থেকে আসা কসমেটিক দোকানের ব্যবসায়ী মো. শাহীন বলেন, ‘আমি সরকার নির্ধারিত ২৫০০ টাকা দিয়ে ৮টি দোকান বরাদ্দ নিয়েছি। একটি দোকান অন্য জায়গায় হওয়ায় আমার ৫১ নম্বর দোকানটি পরিবর্তন করে ৬০ নম্বর দোকান বরাদ্দ নেই। পরবর্তীতে জানতে পারি ৫১ নম্বর দোকানটি স্থানীয়রা পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে। অনেক দোকানদার এসে ঘুরে গিয়েছে স্টল না পেয়ে। অথচ এখনো অনেক জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। স্থানীয় লোকেরা জায়গার অবস্থান অনুযায়ী একেকটি দোকান ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে।’
দিনাজপুর থেকে আগত কুটিরশিল্প পণ্যের দোকানি আল আমিন বলেন, ‘৩৫০০ টাকায় দোকান নিয়েছি স্থানীয় লোকের কাছে। গতবারের মতো এবার খরিদদার নেই। স্থানীয় লোক ছাড়া ভালো জায়গায় পছন্দমতো স্টল পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে ওদের কাছে থেকে দোকান নিছি।’
গোপালগঞ্জ থেকে আসা ব্যবসায়ী দেলওয়ার হোসেন বলেন, ‘২০টি স্টল ৫০ হাজার টাকায় নিজেই বরাদ্দ নিয়েছি। নিজে নিলে এখানে ভালো জায়গা বরাদ্দ পাওয়া যায় না। এই মেলার পঞ্চাশ শতাংশ দোকান স্থানীয়রা বরাদ্দ নিয়ে বেশি টাকায় বিক্রি করেছে। একেকটি দোকান ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে। অনেক দোকানি এমন সিন্ডিকেট দেখে মালপত্র নিয়ে ঘুরে চলে গেছে।’
মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. পারভেজ জানান, ‘অনিয়ম ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারপরেও স্থানীয়রা ফাঁকিবাজি করে দোকান বরাদ্দ নিয়ে পরবর্তীতে বেশি দামে বিক্রি করেছে। আমরা যেকোনও অনিয়ম ও চাঁদাবাজি ঠেকাতে তৎপর রয়েছি। কোনো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’