মিল্লাত হোসেন, মিঠাপুকুর (রংপুর)
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:২৯ পিএম
আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৪৭ পিএম
বেগম রোকেয়ার স্মৃতিস্তম্ভ। প্রবা ফটো
ভারতীয় উপমহাদেশের নারী জাগরণের অগ্রদূত মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ১৪৫তম জন্মবার্ষিকী এবং ৯৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর)। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শিকল ভেঙ্গে অবিভক্ত বাংলায় তিনিই প্রথম নারী শিক্ষার পক্ষে শক্ত হাল ধরেছিলেন। যুক্তির মাধ্যমে বুঝিয়েছিলেন, কেন পুরুষের পাশাপাশি সমাজ গঠনে নারীদেরও ভূমিকা রাখা জরুরি। তাই তো তার লেখা পড়ে আজও নারীরা আলোড়িত ও আন্দোলিত হন। প্রেরণা পান নতুনভাবে বেঁচে ওঠার, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর।
বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই গ্রামের কোনও এক স্থানে ছিল তার আঁতুড়ঘর। ধ্বংসপ্রায় এই বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যেই ধর্মান্ধ সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিশ্বসভায় অনন্য স্থান করে নিয়েছিলেন রোকেয়া।
আশ্বাসে ১৫ বছর পার
২০০৯ সালের ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবসের মেলার আলোচনা সভায় তার ভাতিজি রনজিনা সাবের দাবি তোলেন- বেগম রোকেয়ার দেহাবশেষ কলকাতা থেকে ফিরিয়ে আনার। রংপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক বিএম এনামুল হক দাবিটির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ২০১০ সালে একই স্থানে বিএম এনামুল হক বলেছিলেন, রোকেয়ার দেহাবশেষ পায়রাবন্দে আনার ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। ২০১১ সালের রোকেয়া দিবসের আগে তার দেহাবশেষ পায়রাবন্দে আসবে। এ ঘোষণায় সেদিন পায়রাবন্দবাসী আনন্দিত হয়েছিল। কিন্তু পেরিয়ে গেল ১৫ বছর। এ ব্যাপারে আর কোনও উদ্যোগ নেয়নি জেলা প্রশাসন। পরে প্রতিশ্রুত এই ঘোষণার বাস্তবায়নের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে একাধিক নারী সংগঠন সভা, সিম্পোজিয়াম, গোলটেবিল বৈঠকসহ নানা কর্মসূচি পালন করলেও কোনও অগ্রগতি হয়নি।
নিজ জন্মভূমিতে বাস্তবায়িত হয়নি রোকেয়ার স্বপ্ন
প্রতিবছরই রোকেয়া দিবস এলে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দসহ নানা স্থানে বেগম রোকেয়াকে স্মরণ করার হিড়িক পড়ে যায়। দিবস চলে গেলেই তার কথা সবাই ভুলে যায়। এখনও পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়ার জন্মভিটা অন্ধকারে নিমজ্জিত। রোকেয়া লড়াই করেছিলেন নারীদের শিক্ষার জন্য, লিখেছিলেন বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু এখনও তার নিজ জন্মভূমিতেই ঠেকানো যায়নি বাল্যবিয়ে।
বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র। প্রবা ফটো
পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাহেদুল আলম জানান, মাধ্যমিকের গন্ডি না পেরোতেই তার জন্মভূমি পায়রাবন্দ গ্রামে অন্তত ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের কারণে ঝড়ে পড়ছে। উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি না পেরোতেই বাল্যবিবাহের কারণে ঝড়ে পড়ছে অন্তত ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী। এযেনো বাতির নিচেই অন্ধকার। নিজ জন্মভূমিতেই বাস্তবায়িত হয়নি রোকেয়ার স্বপ্ন। অনেক চেষ্টার পরেও বাল্যবিবাহ ঠেকাতে পারছি না।
বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র একীভূত হচ্ছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে
করোনাকালীন সময় থেকেই সকল প্রকার কার্যক্রম বন্ধ ছিলো বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রে। নামমাত্র অফিস করতো সেখানে কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীরা। অবশেষে সেই অচলাবস্থা শেষে আজ স্মৃতিকেন্দ্রটি একীভূত হবে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী জানান, আজ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা একাডেমির সঙ্গে একীভূতকরণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। স্মৃতিকেন্দ্রটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গবেষণা ও অধ্যয়ন করবে। উন্মুক্ত হবে রোকেয়া চর্চার দ্বার।
বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত করে বাংলা একাডেমি। ২০০১ সালের ১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩ দশমিক ১৫ একর ভূমির ওপর নির্মিত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত স্মৃতিকেন্দ্রটি উদ্বোধন করেন। স্মৃতিকেন্দ্রটিতে রয়েছে ২৬০ আসনবিশিষ্ট একটি আধুনিক মিলনায়তন, ১০০ আসনবিশিষ্ট একটি সেমিনার কক্ষ, ১০ হাজার পুস্তক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন লাইব্রেরি, ৪ হাজার বিভিন্ন বইপত্র-পত্রিকা, গবেষণাকেন্দ্র, সংগ্রহশালা, ২৫টি সেলাই মেশিনসহ একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস, বেগম রোকেয়ার ভাস্কর্য ও উপপরিচালকসহ কর্মচারীদের আবাসন ব্যবস্থা। বাংলা একাডেমির আওতাভুক্ত এই স্মৃতিকেন্দ্রটিতে দীর্ঘদিন থেকে কোনও দৃশ্যমান কার্যক্রম চালু নেই।
রোকেয়ার পৈতৃক ৩৫০ বিঘা ভিটা উদ্ধারে নেই কোনও উদ্যোগ
বেগম রোকেয়ার বাবা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের পায়রাবন্দের শেষ জমিদার ছিলেন। ১৯১৩ সালে তার মৃত্যুর পর তার ৩৫০ বিঘা জমিও ধীরে ধীরে দখলদার ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে চলে যায়। এমনকি পারিবারিক কবরস্থানটিও এখন প্রভাবশালীদের দখলে। এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে রোকেয়া পরিবার, স্বজন ও অনুরাগীদের। রোকেয়া পরিবারের জমি উদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১২ সালে। ওই বছরের ২২ মার্চ ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠনের হয়ে হাইকোর্টে একটি রিট করেন সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। সরকারি সহযোগিতা না থাকায় গেল ১৩ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি বেগম রোকেয়ার বাস্তুভিটা উদ্ধার মামলার কার্যক্রম।
বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, ‘রোকেয়ার বাবা মারা যাওয়ার পর তার পরিবার ও স্বজনরা এই জায়গা জমির প্রতি তাকাননি। এই অবস্থায় সিএসের (৪০ সালের রেকর্ড) সময় কিছু ভূমিদস্যু রোকেয়ার জমিগুলো নিজ নামে রেকর্ড করে নেয়। আজ পর্যন্ত তারা ওই জমি ভোগদখল করে খাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তখন (৪০ সালের রেকর্ড) রোকেয়ার ৪ ভাই-বোন বেঁচে ছিলেন। আইন অনুযায়ী, তাদের নামে জমিগুলো রেকর্ড হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়নি। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন অসাধু কিছু ভূমি কর্মকর্তা জড়িত বলে আমরা মনে করি। এসব জমি উদ্ধারে একটি মামলা হয়েছে, কিন্তু অগ্রগতি নেই। কারণ সরকার পক্ষ চূড়ান্ত শুনানিতে এগিয়ে আসছে না।’
উল্লেখ্য, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় মুসলিম সমাজে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর কোনও চাল ছিল না। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও পরিবারের সবার অগোচরে তার বড় ভাইয়ের কাছে উর্দু, বাংলা, আরবি ও ফারসি পড়তে এবং লিখতে শেখেন। তার জীবনে শিক্ষালাভ ও মূল্যবোধ গঠনে তার ভাই ও বড় বোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। পরবর্তীতে বিহারের ভাগলপুরে সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয়। স্বামীর উৎসাহে ও নিজের আগ্রহে তিনি লেখাপড়ার প্রসার ঘটান। বেগম রোকেয়া ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর মারা যান। বেগম রোকেয়া ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জরিপে ষষ্ঠতম নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে পরিচিত। তার উল্লেখযোগ্য রচনা হলো ‘মতিচূর’, ‘সুলতানার স্বপ্ন’, ‘পদ্মরাগ’, ‘অবরোধ-বাসিনী’। ১৯৭৪ সাল থেকে পায়রাবন্দবাসী বেগম রোকেয়ার স্মরণে রোকেয়া দিবস পালন করে আসছেন। সরকারিভাবে ১৯৯৪ সাল থেকে জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় বেশ ঘটা করেই দিবসটি পালন করা হয়। সারাদেশে দিনটি উদযাপন করা হয় রোকেয়া দিবস হিসেবে।