খুলনার পিএইচটি সেন্টার
মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:৪২ পিএম
আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:৪৩ পিএম
খুলনার গোয়ালখালীর নিভৃত প্রান্তে, গাছগাছালির ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে পিএইচটি সেন্টার (সরকারি দৃষ্টি ও বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়)। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই প্রতিষ্ঠানটি যেন এক আলোকস্তম্ভ, যেখানে দৃষ্টি ও বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের জীবনে প্রতিদিন নতুন সূর্যোদয় ঘটে। এখানে শিশুরা শুধু পড়াশোনা নয়, নিজেকে চিনতে শেখে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬২ সালের ৪ মে খুলনার এক ভাড়া বাড়ির ছোট ঘরে মাত্র ৯ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে পিএইচটি সেন্টার। দুই বছর পর ১৯৬৪ সালে ৪ দশমিক ৪০ একর জমিতে গড়ে ওঠে বিদ্যালয় ভবন, কারিগরি প্রশিক্ষণ শাখা ও আবাসিক সুবিধা। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য চালু হয় বাঁশ-বেত শিল্প, বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য দর্জি, ছোবড়া ও সেলাই প্রশিক্ষণ। সেই ছোট পদক্ষেপই আজ খুলনার গর্বের এক মহীরূহ।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ৪২ জন স্থায়ী কর্মী ও ২ জন খণ্ডকালীন শিক্ষক মিলে এই সেন্টারের প্রাণ। আবাসিক শিক্ষার্থীর আসন ১৩০, অনাবাসিক ৫০। প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাসিক বরাদ্দ ৫,০০০ টাকার মধ্যেই থাকে খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা ও চিকিৎসা। এ প্রতিষ্ঠানের ৭৩ জন শিক্ষার্থী চাকরিতে যুক্ত, দর্জি হিসেবে কাজ করছেন ৩৮০ জন, ৩৩০ জন বাঁশ-বেত শিল্পে, চর্ম শিল্পে আত্মনির্ভর ৭৩ জন এবং শতাধিক শিক্ষার্থী চিত্রকলা ও তাঁত শিল্পে সফল। শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছে। বাক-শ্রবণ ৬ শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ছবি আঁকায় পুরস্কৃত হয়েছে।
এবার এইচএসসির ফল বিপর্যয়ের মধ্যেও তাদের সফলতায় খুশি পিএইচটি সেন্টার কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক ও সহপাঠীরা। দুই বোন পেয়েছেন এ গ্রেড, দুজনই জানালেন তাদের স্বপ্নের কথা।
বড় বোন ফিরোজা খাতুন বলেন, ১৩ বছর ধরে এখানেই রয়েছি আমরা। পিএইচটি সেন্টারে প্রথম শ্রেণিতে আমি ও আমার ছোট বোন ভর্তি হয়েছিলাম। দৌলতপুর মুহসীন মহিলা কলেজ থেকে দুইজনই এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। আমি ৪ পয়েন্ট পেয়ে পাস করেছি, আর ছোট বোন সোনিয়া পেয়েছে ৪.৬৭ পয়েন্ট।
নিজের স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে ফিরোজা বলেন, আমি শিক্ষক হতে চাই।
ছোট বোন সোনিয়া খাতুন বলেন, আমাদের গ্রামের বাড়ি কয়রা উপজেলায় হলেও ২০১৬ সালে বাবা-মা দু’জনই কাজের জন্য ভারতে গিয়েছেন। এখনও তারা সেখানেই রয়েছেন। রেজাল্ট পেয়েই তাদের জানিয়েছি।
তিনি বলেন, আরও ভালো করা সম্ভব হতো, বিশেষ করে বেইল পদ্ধতির বইগুলো থাকলে। আইসিটি, বাংলা ও ইংরেজি বেইল পদ্ধতির বই ছিল। বাকিগুলো শুনে শুনে মুখস্থ করতে হতো।
বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী শাম্মী আক্তার কথা বলতে বা শুনতে না পারলেও ইশারা ভাষা ও লেখার মাধ্যমে পরীক্ষা দেন। শাম্মী ইশারায় জানায়, কাজ শিখে আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।
পিএইচটি সেন্টারের তত্ত্বাবধায়ক ও সমাজ সেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এ বছর ৩ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও ২ জন বাকশ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। এর মধ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ৩ জনের মধ্যে ২ জন এ, একজন এ মাইনাস এবং বাকশ্রবণ প্রতিবন্ধী দুজনের একজন বি ও একজন সি গ্রেড পেয়ে পাস করেছেন।
এখানকার অনেক ছাত্রছাত্রী বলেন, এখন ব্রেইলে বিজ্ঞান আর কুরআন পড়ি, সবই সহজ মনে হয়। আমরা শুধু পড়াশোনা করি না, গান গাই, ছবি আঁকি, খেলাধুলা করি। এখানে আমরা বুঝেছি আমাদের জীবনও মূল্যবান। এখানে দর্জি, বাঁশ-বেত, চর্ম, চিত্রকলা ও তাঁত শিল্পে শত শত শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মনির্ভর হয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধায়ক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সেন্টারের শতভাগ নিরাপত্তার জন্য সীমানা প্রচীর নির্মাণসহ যদি আরও শিক্ষক ও আধুনিক সরঞ্জাম পেতাম, তাহলে শিশুদের সাফল্য আরও ভালো হতো। শিক্ষার পাশাপাশি পুনর্বাসনই আমাদের মূল লক্ষ্য।