ফরিদপুর
আজিজুল হক, ফরিদপুর
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৫৪ এএম
জুতার আঠা, ফিটকিরি, নিম্নমানের চিটাগুড়, নিষিদ্ধ হাইড্রোজ, নন-ফুডগ্রেট রং ক্ষতিকর রঙ এবং ফ্লেভার, পচা মিষ্টি, মিষ্টির নষ্ট গাদ, ময়দা, সোডাসহ নানা বিষাক্ত উপাদান দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে মণকে মণ ভেজাল খেজুর ও আখের গুড়।
ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে এসব ভেজাল গুড়। দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র এ ভেজাল গুড় তৈরি করে এলেও রহস্যজনক কারণে অপরাধীরা ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অবশেষে ভেজাল গুড় তৈরির কারখানায় হানা দিয়ে বিপুল পরিমাণ ভেজাল গুড়, গুড় তৈরির সরঞ্জাম ও উপকরণ জব্দ করেছে জেলা প্রশাসন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুর শহরতলির মাচ্চর ইউনিয়নের শিবরামপুরের ছোট বটতলা এলাকায় স্বপন কুমার শীল গড়ে তোলেন বিশাল একটি ভেজাল গুড়ের কারখানা।
চারদিকে উঁচু টিনের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং একাধিক সিসি ক্যামেরা লাগানো অত্যান্ত নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে জায়গায় কারখানাটিতে রাত-দিন চলতো ভেজাল গুড় উৎপাদন। প্রতিদিন রাতের আঁধারে ট্রাকে করে আনা হতো ভারতীয় নিম্নমানের চিটা গুড়। প্রতিদিন টনকে টন ভেজাল গুড় উৎপাদন হতো এ কারখানায়। এসব গুড় ঢাকা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হতো। বাজারে খেজুর রস পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন বাজারে সয়লাব হয়ে গেছে খেজুর গুড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানাটিতে ভেজাল গুড় উৎপাদন করা হলেও প্রশাসনের কেউ এসে দেখেননি, এখানে কী ধরনের গুড় তৈরি হচ্ছে। কারখানার মালিক স্বপন কুমার শীল প্রভাবশালী একটি মহলকে ম্যানেজ করেই এ অপকর্ম করে আসছিলেন। স্থানীয়দের কখনও কারখানায় ঢুকতে দেওয়া হতো না। সিসি ক্যামেরা দিয়ে সব সময় নজরদারি করা হতো।
বিভিন্ন সময় কারখানাটিতে ভেজাল গুড় উৎপাদন হচ্ছে তা অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে তুলে ধরলেও রহস্যজনক কারণে প্রশাসন ছিল নীরব। এতে কোনো অভিযান চালানো হয়নি।
সম্প্রতি, ভেজাল গুড় তৈরি হচ্ছে এমন অভিযোগের দাবি জোরালো হয়। গত মঙ্গলবার বিকেলে জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার আতিকুর রহমানের নেতৃত্বে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কারখানাটিতে অভিযান চালায়। অভিযানের খবর পেয়ে কারখানার মালিক স্বপন কুমার শীল ও কর্মচারীরা পালিয়ে যায়। পরে কারখানায় অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে সাড়ে ৬ হাজার কেজি ভেজাল গুড়, গুড় তৈরির উপকরণ ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পরে জব্দ হওয়া ভেজাল গুড় ধ্বংস করা হয়। ভেজাল গুড় তৈরির জন্য কারখানাটি এ সময় সিলগালা করে দেওয়া হয়। কারখানা মালিক পালিয়ে যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অভিযানের সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার আতিকুর রহমান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা আজমল ফুয়াদ, জেলা ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান, জেলা নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক বজলুর রশিদ।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে জানান, ভেজাল গুড় তৈরির হোতা স্বপন কুমার শীল প্রভাবশালী হওয়ায় সে সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। এ ধরনের জঘন্য কাজের জন্য তার উপযুক্ত শাস্তি হওয়া দরকার।
সহকারী কমিশনার আতিকুর রহমান বলেন, অভিযানে কারখানায় টিনজাত চিটাগুড়ের সঙ্গে নিষিদ্ধ হাইড্রোজ, ফিটকিরিসহ ক্ষতিকারক কেমিকেল মিশিয়ে চিনি ব্যবহার করে ভেজাল গুড় তৈরি হচ্ছিল। সাড়ে ৬ হাজার কেজি গুড় ও রাসায়নিক ধ্বংস করা হয়েছে। একই সঙ্গে কারখানাটি সিলগালা করা হয়। তিনি বলেন, মালিককে না পাওয়ায় তাকে আসামি করে নিরাপদ খাদ্য আইনে একটি মামলা করা হয়েছে।
ক্যাপ: ফরিদপুর শহরতলির মাচ্চর ইউনিয়নের শিবরামপুরের ছোট বটতলা এলাকায় গত মঙ্গলবার ভেজাল গুড়ের কারখানা অভিযান চালানো হয়।