বগুড়া
অরুপ রতন, বগুড়া
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:২৯ পিএম
আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:৫৯ পিএম
বগুড়া শহরে দ্রুত নগরায়ণের ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গড়ে উঠছে অসংখ্য বহুতল ভবন। কিন্তু এসব ভবনের বেশিরভাগই নির্মাণ হয়েছে বিল্ডিং কোড ও সরকারি নীতিমালা না মেনে। ফলে নিউ মার্কেট, সপ্তপদী মার্কেটসহ পুরনো বিপণিবিতানগুলো যেমন অগ্নি ও ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে পড়েছে, তেমনি নতুন নির্মিত অনেক ভবনও পরিণত হচ্ছে সম্ভাব্য দুর্যোগের কেন্দ্রে।
তদারকি সংস্থার নীরবতা আর অব্যবস্থাপনার সুযোগে ঝুঁকি প্রতিদিনই বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নাগরিক সংগঠন ও সচেতন মহল বলছে, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পৌরসভা ও প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া জরুরি।
সরেজমিন দেখা গেছে, বগুড়া শহরে জনবসতির পাশাপাশি ক্রমাগত বাড়ছে নগরায়ণের পরিধি। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। কিন্তু এসব ভবনের কাঠামো, স্থাপত্য, ভিত্তি কৌশল, অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থা, গ্যাস-বিদ্যুৎ লাইনের ছাড়পত্র, আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ, ইটিপি বাস্তবায়নসহ প্রয়োজনীয় নীতিমালা মানা হচ্ছে না। এমনকি কিছু এলাকায় রাজমিস্ত্রি দিয়ে কলাম ছাড়া ইটের গাঁথুনির ওপরই ঝুঁকিপূর্ণভাবে দোতলা-তিনতলা ভবন তৈরি করা হচ্ছে।
পৌর সূত্রে জানা যায়, ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বগুড়া পৌরসভা এখন ৬৯.৫৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের। ২১ ওয়ার্ডের এ পৌরসভায় জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। পৌরসভার নীতিমালা অনুযায়ী ৬ তলা থেকে ১৪ তলা পর্যন্ত ভবনকে বহুতল ভবন বলা হয়। শহরে এমন বহুতল ভবনের সংখ্যা বর্তমানে সাড়ে তিন শতাধিক। এর মধ্যে ৬ তলা অনুমোদন নিয়ে ৯ তলা বা ১০ তলা করে ফেলার ঘটনাও রয়েছে।
পৌরসভার আইন শাখার তথ্যমতে, বগুড়া পৌর এলাকায় প্রায় ৬৪ হাজার বসতবাড়ি আছে। এর মধ্যে অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ করায় দুই শতাধিক ভবনকে অবৈধ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ২৫০টি অভিযোগ আসেÑ নিয়মবহির্ভূত নির্মাণ, সীমানা বিরোধ, রাস্তা ও ড্রেনের জায়গা দখলই এসব অভিযোগের মূল কারণ।
থাইল্যান্ডভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এশিয়ান ডিজাস্টার প্রিপারেডনেস সেন্টারের (এডিপিসি) গবেষণায় দেখা গেছে, বগুড়া পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড ও ২০ নম্বর এলাকার মাটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং অঞ্চল দুটি ভূমিকম্পপ্রবণ। তবুও এসব এলাকাতেও নিয়মনীতি না মেনে বহুতল ভবন নির্মাণ চলছে।
শহরের সূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা মাহাবুব হাসান সোহাগ বলেন, কর্তৃপক্ষের সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে বগুড়া শহর দিন দিন বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বগুড়া জেলার সভাপতি প্রকৌশলী সাহাবুদ্দিন সৈকত বলেন, অনেকেই ইচ্ছেমতো বাড়িঘর নির্মাণ করছেন। যেকোনো দুর্ঘটনায় অগ্নিনিবারণের জরুরি ব্যবস্থা না থাকায় এতে যেমন আগুনের ঝুঁকি বাড়ছে, তেমনি ব্যক্তিস্বার্থে ভবনের আকার পরিবর্তনে ভূমিকম্পের ঝুঁকিও রয়েছে। সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবের কারণেই শহর ঝুঁকিতে আছে।
বগুড়া পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ আল মেহেদী হাসান জানান, যারা নিয়ম মেনে পরিকল্পনা জমা দেন না, তাদেরকে অনুমোদন দেওয়া যায় না। অনেকেই অনুমোদন পাওয়ার পরও অবৈধভাবে ভবনের উচ্চতা বাড়িয়ে থাকে। অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
চলতি বছরের ১৫ মে সুউচ্চ ভবন নির্মাণের অনুমোদনের জন্য ৬৩টি ফাইল নিয়ে গণপূর্ত বিভাগে মিটিং হলেও কতগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কেউ কিছু বলেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বগুড়া গণপূর্ত অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, শহরে সাড়ে তিন শতাধিক ভবন অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছে। ভবনগুলোর বেশিরভাগই ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। যথাযথ জায়গা না রাখা এবং দুর্বল স্ট্রাকচারাল নকশার কারণে এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বগুড়া গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. ফারজানা আকতার বলেন, আমরা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার পর কেউ নিয়ম না মানলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বগুড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক শরীফুল ইসলাম বলেন, বগুড়ার অধিকাংশ মার্কেট ও অবৈধ ভবন আগুন ও ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি।