প্রবি প্রতিবেদন
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ২০:৪২ পিএম
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার দাবিতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিভিন্ন সড়কে ‘ব্লকেড কর্মসূচি’ পালন করা হয়েছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এ কর্মসূচি পালন করা হয়। জরুরি সেবা ছাড়া সব ধরনের যান চলাচল এ সময় বন্ধ থাকে। খবর প্রতিদিনের বাংলাদেশের অফিস ও প্রতিবেদকদের পাঠানোÑ
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার দাবিতে ‘ব্লকেড কর্মসূচি’ পালন করেছেন আন্দোলনকারীরা। রবিবার (৩০ নভেম্বর) সকাল ৯টা থেকে এ কর্মসূচি পালন করেন তারা।
জানা যায়, সকালে লোহাগাড়া, সাতকানিয়া ও কক্সবাজারের চকরিয়া এলাকায় স্থানীয়রা ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক উন্নয়ন আন্দোলন’-এর ব্যানারে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। লোহাগাড়ার আমিরাবাদ, সাতকানিয়ার কেরানিহাট এবং চকরিয়ার মাতামুহুরী সেতু এলাকায় একযোগে অবরোধ শুরু হলে মহাসড়কের দুপাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। এ সময় জরুরি সেবা ছাড়া সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
অবরোধকারীরা জানান, এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক এখন ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনা ঘটছে। লবণবাহী গাড়ির কারণে সড়ক পিচ্ছিল হয়ে যায়, আবার কয়েকটি স্থানে তীব্র বাঁক ও ঢালু অংশ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার ওসি সালাউদ্দিন চৌধুরী জানান, অবরোধের খবর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মাঠে কাজ করছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনরত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেন বাস্তবায়ন পরিষদের সমন্বয়ক মিনহাজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে ৬৭টি জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক-১ হলো ঢাকা-কক্সবাজার মহাসড়ক। এই সড়কটি পর্যটন শিল্প, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্ব বহন করে। অথচ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও এ সড়কটি ৬ লেনে উন্নীত করা হয়নি।
কক্সবাজার : চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি যেন ‘মৃত্যুর করিডোর’। চলতি বছরের গেল ১১ মাসে এ মহাসড়কে ১৫৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫০ জন আর আহত হয়েছেন ৩৫১ জন। এসব দুর্ঘটনার পেছনে অপ্রশস্ত সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, বেপরোয়া গতি, লবণাক্ততার কারণে পিচ্ছিল সড়ক, অবৈধ যানবাহন চলাচল ও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর প্রেক্ষিতে এ মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণের দাবিতে রবিবার ৩ ঘণ্টাব্যাপী চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করা হয়েছে।
সকাল ১০টায় মহাসড়কের চকরিয়ার মাতামুহুরী সেতুটির দুপাশে রশি দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক উন্নয়ন আন্দোলন নামের একটি সংগঠনের নামে জনতা এই ব্যারিকেড দেন।
ঈদগাঁর বাসিন্দা ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে যে পরিমাণ ৩ চাকার গাড়ি রয়েছে; তা বাংলাদেশের আর কোনো মহাসড়কে আছে কি না সন্দেহ রয়েছে। এই ৩ চাকার গাড়ির কারণে তো দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। এগুলো তো মহাসড়ক থেকে দূর করতে পারছে না প্রশাসন। এখন কাকে দোষ দেবেন?”
চকরিয়ার এলাকার বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি খুবই সরু। কিছুদূর পরপর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক। লবণবোঝাই ট্রাক আর ৩ চাকার গাড়িগুলোর চলাচল বেশি। যার কারণে এই মহাসড়কে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে।’
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বাসচালক রহিম উদ্দিন বলেন, ‘কক্সবাজার একটি পর্যটন নগরী। বাংলাদেশের সব এলাকার মানুষের এখানে যাতায়াত। কিন্তু রাস্তা ছোট, যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেশি। তার ওপর ৩ চাকার দৌরাত্ম্য অনেক বেশি। এসব কারণে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে।’
চকরিয়ার এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইফ বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন যান ও নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয় না।
এদিকে হাইওয়ে পুলিশ বলছে, বেপরোয়া গতির যানবাহন ও অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এই মহাসড়ক চারলেন কিংবা ছয় লেনে উন্নীত করা ছাড়া বিকল্প নেই মনে করে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ।
কক্সবাজারস্থ মালুমঘাট হাইওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক জিয়া উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে দুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে যানবাহনের বেপরোয়া গতি। হাইওয়ে পুলিশ সড়কে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযানে ৭০ থেকে ৮০ ওপরে গতি হলেই মামলা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও ৩ চাকার গাড়িগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারস্থ বিআরটিএ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, কক্সবাজার পর্যটননগরী হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পর্যটকরা গাড়িযোগে কক্সবাজার আসছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে মহাসড়কটি অনেক ছোট আর যানবাহনের পরিমাণ অনেক বেশি। যদি এই মহাসড়কটি ৪ থেকে ৬ লেনে উন্নীত করা হয় তাহলে দুর্ঘটনা কমে আসবে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীতকরণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। এখন ফাইনাল রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি আমরা।’
লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় মহাসড়ক ছয় লেনে সম্প্রসারণের দাবিতে ব্লকেড কর্মসূচি পালন করছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক উন্নয়ন আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।
রবিবার সকাল ৯টা থেকে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বটতলী মোটর স্টেশনের ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে এ কর্মসূচি চলমান।
মহাসড়কের সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নিয়মিত দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন আন্দোলনকারীরা। তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়কটি ছয় লেন করার আশ্বাস মিললেও এখনও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তাই আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
ব্লকেডে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শত শত মানুষ অংশ নেন। আন্দোলনকারীরা জানান, দ্রুত মহাসড়ক ছয় লেনে সম্প্রসারণের উদ্যোগ না নিলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।