নওগাঁ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ১৫:৫১ পিএম
আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:০২ পিএম
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার মিঠাপুর-মথুরাপুর–পাহাড়পুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জমির খাজনা ও অন্যান্য সেবা ঘিরে চলছে ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুস বাণিজ্যের অভিযোগ।
সরকারি নিয়মে নির্ধারিত খাজনার হার অটোমেটিক সফটওয়্যার অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেটি কার্যকর নয় বলে অভিযোগ করেছেন সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ। বরং অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে খাজনার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ওই অফিসের কতিপয় দালালের মাধ্যমে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রাসেল হোসেন এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
রবিবার (৩০
নভেম্বর) ভুক্তভোগীরা জানান, অফিসটিতে একটি সক্রিয় দালালচক্রকে ব্যবহার করে নিয়মিত
ঘুস আদায় করা হয়। জমির খারিজ, নামজারি, রেকর্ড সংশোধন, খাজনা প্রদান, যে সেবাই প্রয়োজন
হোক না কেন, টাকা ছাড়া নাকি মিলছে না কোনো সেবা। ফলে কর্মব্যস্ত কৃষক থেকে শুরু করে
সাধারণ ভূমি মালিক, সবাইকে বারবার অফিসে ঘুরতে হচ্ছে, পোহাতে হচ্ছে অব্যাহত হয়রানি।
স্থানীয় সুজাউল
হোসেন জানান, ‘আমার শ্বশুরের তিনটি খতিয়ানের মোট ১৫ শতাংশ জমির জন্য প্রথমে ৬৯ হাজার
৪১৪ টাকার খাজনা রশিদ দেন তহশিলদার রাসেল হোসেন। পরে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে ৩০
হাজার টাকা ঘুস দিলে অনলাইনে সেই একই খতিয়ানের জন্য ৫ হাজার ৮৪২ টাকার রশিদ পাই। সফটওয়্যারে
খাজনা কমানো-বাড়ানোর সুযোগ নেই, অথচ ঘুস দিলে টাকাই কমে যায়, এটা কীভাবে সম্ভব। প্রতিদিন
আমাদের মতো কৃষকদের কাছ থেকে লাখ টাকার মতো অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। আমি এর বিচার চাই।
ফাতেমা বেগম
বলেন, চেক (খাজনার রসিদ) তুলতে গেলে প্রথমে ২৮ হাজার টাকা ঘুস চাওয়া হয়। দিতে না পেরে
ফিরে আসি। দ্বিতীয় বার গিয়ে ২০ হাজার টাকা দিলে ৫৭১ টাকা চেক (খাজনার রসিদ) তুলে দেয়।
পরে বাকি টাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে বলে এটাই কমিয়ে দিয়েছি। আমার সেই টাকা আজও ফেরত
পাইনি।
গত ১৪ জুলাই
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সোহেল রানা এক ভুক্তভোগীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মিঠাপুর
ভূমি অফিস পরিদর্শনে গেলে উপস্থিত মানুষের তোপের মুখে পড়েন অভিযুক্ত কর্মকর্তা রাসেল
হোসেন। সেই তদন্তের প্রায় দুই মাস পার হলেও এখনো তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা
নেওয়া হয়নি। ফলে ভুক্তভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গত এক সপ্তাহ
ধরে বিভিন্ন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
তৌহিদ হোসেন
নামের এক কৃষক জানান, তিনটি খতিয়ানের জন্য প্রথমে ৪ লাখ টাকার রশিদ দেওয়া হয়। পরে এক
মহুরীর মাধ্যমে ২ লাখ টাকা ঘুস দিলে মাত্র
২ হাজার ২০০ টাকার রশিদ হাতে পান।
আলেপ উদ্দিন,
যিনি ৪০ বছর ধরে পাহাড়পুর বাজারে ব্যবসা করছেন। তিনি জানান, দোকানের ডিসিয়ার কাটার
জন্য ১ লাখ টাকার চুক্তি করে ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হলেও ছয় মাসেও কাজ হয়নি। টাকা ফেরত
চাইলে টালবাহানা করা হচ্ছে।
এনামুল হক
অভিযোগ করেন, খারিজ করে দেওয়ার আশ্বাসে ৩ হাজার টাকা নিলেও চার মাসেও তার খারিজ হয়নি
বরং আবেদনটি বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় ফজলে
মওলা বলেন, খাজনার বিষয়ে মৌখিকভাবে এক রকম কথা বলে, পরে চেকে কম টাকার রশিদ দিলেও পুরো
টাকা নেয়। প্রশাসন কঠোর নজরদারি দিলে এসব বন্ধ হবে।
ঘুষের বিষয়ে
বক্তব্য জানতে সাংবাদিকরা রাসেল হোসেনের কার্যালয়ে গেলে তিনি উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত
মোটরসাইকেলে করে অফিস ত্যাগ করেন। পরে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি
কল রিসিভ করেননি।
বদলগাছী উপজেলা
সহকারী কমিশনার (ভূমি) পলাশ উদ্দিন বলেন, রাসেল হোসেনের বিরুদ্ধে কিছু মৌখিকভাবে অভিযোগ
পেয়েছি। লিখিত অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বদলগাছী উপজেলা
নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান ছনি বলেন, অভিযোগগুলো নওগাঁ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তদন্তাধীন।
লিখিত অভিযোগ পেলে উপজেলা প্রশাসন থেকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দীর্ঘদিন ধরে
চলা ঘুস বাণিজ্য ও হয়রানির শিকার সাধারণ মানুষ
দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, ভূমি অফিসে স্বচ্ছতা
ফিরবে, দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিত হবে এবং সাধারণ মানুষের কষ্টের অর্জিত অর্থ আর কেউ
অবৈধভাবে হাতিয়ে নিতে পারবে না।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত
জেলা প্রশাসক ( রাজস্ব ) সোহেল রানা বলেন, রাসেল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে
তদন্ত করে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে নির্দেশনা এলে সে অনুযায়ী পরবর্তী
প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।