সঞ্জিত চক্রবর্তী, চাটমোহর (পাবনা)
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:০০ পিএম
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:০৩ পিএম
চলনবিল অধ্যুষিত পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার রুহুলবিলে চলছে ঐতিহ্যবাহী বাউত উৎসব। প্রতিবছর অগ্রহায়ণ–পৌষ মাসে অনুষ্ঠিত এই উৎসবকে ঘিরে বিলে হাজারো মানুষের সমাগম দেখা যায়। ভোরের আলো ফুটতেই চাটমোহর, বড়াইগ্রাম, নাটোর, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে শত শত শৌখিন মৎস্যশিকারি পলো, জাল, বাদাই জালসহ নানা উপকরণ নিয়ে হাজির হন বিলপাড়ে। এরপর শুরু হয় দলবদ্ধ মাছ ধরা।
লোকজ রীতিতে দল বেঁধে মাছ শিকারের এ আয়োজনকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘বাউত উৎসব’। শিকারিদেরই বলা হয় ‘বাউত’, আর তাদের নাম থেকেই উৎসবের নামকরণ। শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকাল থেকেই রহুলবিলে শত শত বাউতের ঢল নামে। শিকারিরা জানান, চলতি মৌসুমে অন্তত দুই সপ্তাহ চলবে এ উৎসব।

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল এলাকার মৎস্যশিকারি নুরুজ্জামান বলেন, ‘বাউত উৎসবে বোয়াল, শোল, রুই, কাতলসহ দেশীয় প্রজাতির নানা রকম মাছ পাওয়া যায়। প্রতি বছর এই সময়ে বাউত উৎসেব অংশ গ্রহণ করি। চাটমোহরের বোঁথড় গ্রামের আজগর আলী পলো হাতে নেমেছেন মাছ ধরতে। তিনি বলেন, মাছ ধরা আমার দীর্ঘদিনের শখ। যত ব্যস্ততাই থাকুক, উৎসবে আসি। তবে আগের তুলনায় মাছ কমেছে।
চলনবিল অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই বাউত উৎসব এখন শুধু মাছ ধরা নয়; এটি বিলাঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামষ্টিক আনন্দের অন্যতম বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে। পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, কুষ্টিয়া, টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো শৌখিন মৎস্যশিকারি এবারও যোগ দিয়েছেন এই উৎসবে। গতকাল শনিবার ভোরে পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার রুহুলবিলে দেখা যায়Ñএই লোকজ উৎসবের বর্ণিল পরিবেশ।
ভোরের আলো ফোটার আগেই বিলপাড়ে হাজির হন নানা বয়সী মানুষ। কারও হাতে পলো, কারও হাতে খেয়া জাল, বাদাই জালসহ নানা রকম উপকরণ। দলবেঁধে বিলে নেমে মাছ ধরতে ব্যস্ত সবাই। কেউ বোয়াল, শোল, রুই–কাতল পাচ্ছেন, কেউ ফিরছেন খালি হাতে। তবুও উৎসবের আনন্দে নেই হতাশা। তবে এ বছর বিলে আগের মতো মাছ না মিলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিকারিরা। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আগে থেকেই চায়না দুয়ারী, কারেন্ট জাল ও গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার করে বিলের মাছ নিধন করেছে। এতে ছোট-বড় মাছ ও জলজ পোকামাকড় মারা যাওয়ায় পানিতে সৃষ্টি হয়েছে দুর্গন্ধ।
ভাঙ্গুড়ার পাটুলিপাড়া এলাকায় দেখা গেছে, রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে কুষ্টিয়া, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল থেকে আসা অন্তত ২০টি বাস। কেউ মোটরসাইকেল, ইজিবাইক বা অটোরিকশায় করেও এসেছেন। রুহুলবিলে পৌঁছে সবাই দলবেঁধে নেমে পড়েন মাছ ধরার আনন্দে।
পানি নেমে যাওয়ার পর প্রতি বছর নভেম্বরের শেষ বা ডিসেম্বরের শুরু থেকে মাসব্যাপী চলে বাউত উৎসব। সপ্তাহের প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার চলনবিলের রুহুল, ডিকশির, রামের বিলসহ বিভিন্ন স্থানে লোকজ রীতিতে মাছ ধরেন শিকারিরা।
সিরাজগঞ্জ থেকে মাছ শিকারে আসা রওশন বলেন, বাউত উৎসবের কথা অনেক শুনেছি। এবার ছয়টি বাসে দুই শতাধিক লোক নিয়ে এসেছি। এত মানুষ একসঙ্গে মাছ ধরার আনন্দই আলাদা।
এ বিষয়ে পাবনা জেলা মৎস্য অফিসার দীপক কুমার পাল বলেন, বাউত উৎসব মূলত সামাজিক উৎসব, চাটমোহর-ভাঙ্গুরাসহ চলনবিল অধ্যুষিত এলাকার লোকজন এই উৎসবে অংশ নেন। মাছ যাই পাক না কেনÑউৎসবের সঙ্গে তারা এটা করেন।
তিনি বলেন, দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণের জন্য বিলে আমরা যে অভয়াশ্রম তৈরি করেছিÑ সেই এরিয়া বাদে তারা মাছ ধরবে। আমরা উৎসব বন্ধ করার পক্ষে না। তবে তারা যেন আইন মেনে মাছ ধরে।