খুলনা অফিস
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:৫৮ পিএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:৫৩ পিএম
খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বেশি যে নামটি উচ্চারিত হচ্ছে, তিনি কৃষ্ণ নন্দী- জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী এবং একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই নেতার প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতিতে যেমন নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তেমনি জাতীয় পর্যায়েও জন্ম নিয়েছে বিস্তর কৌতূহল।
ডুমুরিয়ার চুকনগর গ্রামের বাসিন্দা কৃষ্ণ নন্দী ২০০৩ সালে জামায়াতে ইসলামে যোগ দেন। বর্তমানে ডুমুরিয়া উপজেলা জামায়াতের হিন্দু শাখার সভাপতি এবং স্থানীয় সনাতন কমিটিরও সভাপতি। গত এক বছরে মিয়া গোলাম পরওয়ারের ডুমুরিয়া ও ফুলতলায় বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক সমাবেশে তার সক্রিয় উপস্থিতি ও নেতৃত্ব আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে। এসব সমাবেশে সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী–পুরুষের দৃশ্যমান অংশগ্রহণ তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দলের ভেতরেও ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
মনোনয়ন বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী কৃষ্ণ নন্দী
তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী। ২০০৩ সাল থেকে দল করছি, সব দুঃসময়েও জামায়াতের পাশে ছিলাম। স্থানীয় পর্যায়ে সনাতন কমিটি ও হিন্দু কমিটির নেতৃত্বে আছি, তাই দাকোপ-বটিয়াঘাটায় দল আমাকেই এগিয়ে রাখবে।
দলীয় সূত্রও বলছে, খুলনা-৫ আসনে মিয়া গোলাম পরওয়ার নিজে প্রার্থী থাকলেও খুলনা-১ আসনে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকার ভোটব্যাংক বিবেচনায় কৃষ্ণ নন্দীর প্রার্থিতা নিয়ে ইতিবাচক ‘সিগন্যাল’ রয়েছে।
হিন্দু সম্প্রদায় তাকে সমর্থন করবে কি? এই প্রশ্নেই সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম।
কৃষ্ণ নন্দীর ব্যাখ্যা- জামায়াতে হিন্দু-মুসলমান সবাইকে মানুষ হিসেবেই দেখা হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই এখানে বেশি। আমার সম্প্রদায়ের মানুষ বলেছেন- আপনি হিন্দু মানুষ, আমরা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেব, আপনাকে জেতাব।
তাঁর দাবি, সনাতন ভোটাররা এবার ধর্মের ভিত্তিতে নয়, ন্যায়-সততার ভিত্তিতে ভোট দিতে চান।
প্রার্থী হলে তার অঙ্গীকার
তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচিত হলে তার প্রথম তিনটি লক্ষ্য হবে, সন্ত্রাসমুক্ত এলাকা গঠন, চাঁদাবাজি দমন ও মাদক নির্মূল। এছাড়া দাকোপ-বটিয়াঘাটার ভয়াবহ নদীভাঙন রোধে জরুরি প্রকল্প আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
জামায়াত কেন বেছে নিলেন
এই প্রশ্নে তার ব্যাখ্যা- কঠোরভাবে আদর্শভিত্তিক জামায়াত হলো ন্যায়-সততার দল। এখানে দুর্নীতি নেই, চাঁদাবাজি নেই, মাদক নেই। শান্তি-সমৃদ্ধি আনার দল বলে আমি জামায়াতকে বেছে নিয়েছি। ২০০৩ সাল থেকে এটি করছি, হঠাৎ নয়। আগের রাজনৈতিক সরকারে কোণঠাসা ছিলেন। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দাপটে থাকা এই এলাকায় তিনি জামায়াত করার কারণে বিভিন্নভাবে চাপের মুখে ছিলেন বলে অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় তখন মন্ত্রী ছিলেন নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। তিনি আমাকে এড়াতেন, সন্দেহ করতেন, অনেকভাবে কোণঠাসা করে রাখতেন।
নির্বাচনী সমীকরণে নতুন বাস্তবতা
খুলনা–১ আসনে বিএনপি এখনও প্রার্থী ঘোষণা না করায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও অনিশ্চয়তায় রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন সাবেক সাংগঠনিক নেতা আমীর এজাজ খান, জিয়াউর রহমান (পাপুল), পার্থ দেব মণ্ডল এবং কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল। বাম গণতান্ত্রিক জোটের তরফে দাকোপ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান কিশোর কুমার রায়ও মাঠে আছেন।
তবে আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনে না থাকায় নতুন এক ভোটভিত্তি তৈরি হয়েছে। কৃষ্ণ নন্দীর বিশ্লেষণ- হিন্দুরাই এখানে সংখ্যায় বেশি। আওয়ামী লীগ না থাকায় সবাই স্বাধীনভাবে ভোট দিতে আসবে। দাঁড়িপাল্লায় ভোট পড়বে, এবং হিন্দু প্রার্থী হিসেবে আমাকে গ্রহণ করতেই সুবিধা হবে।
খুলনা-১ আসনে একজন হিন্দু নেতাকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে দেখা- এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী বাস্তবতায় বিরল একটি ঘটনা। কৃষ্ণ নন্দী সত্যিই প্রার্থী হলে শুধু দাকোপ-বটিয়াঘাটা নয়, দেশের রাজনীতিতেও নতুন আলোড়ন আনবে- এমনটাই বলছে স্থানীয়রা। মনোনয়ন পাওয়া বা না-পাওয়া দলীয় সিদ্ধান্তে নির্ভর করলেও এলাকায় এখন যেকোনো আলোচনার শুরু-শেষ কৃষ্ণ নন্দীকে ঘিরেই।