মেহেদী হাসান রনি, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)
প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ১২:০৭ পিএম
পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে যাত্রী সংকটে পড়েছে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাট। এতে আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় ফেরি ও লঞ্চঘাটের শ্রমিক কর্মচারীরা মানবেতর জীবন পার করছেন।২০২২-এর ২৫ জুন পদ্মা সেতু চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘকালের স্বপ্ন পূরণ হয়। ঢাকার সঙ্গে সরাসারি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাতায়াতের পথ খুলে যায়। সময় ও ভোগান্তি কমে আসে। কিন্তু দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাটের শ্রমিক-কর্মচারী ছাড়াও হাজারো মানুষের জীবন প্রায় থমকে গেছে। একসময়ের প্রধান এই নৌপথ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রাণকেন্দ্র ছিল। দৌলতদিয়া ঘাটে দিনরাত ৫-৭ কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি দৃশ্যমান হতো। মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছিল স্থায়ী-অস্থায়ী হোটেল-রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল, দোকানপাট। হকারের হাঁকডাক সারাক্ষণই শোনা যেত।
প্রতিদিন রিকশাচালকরা
যাত্রী পরিবহনে ব্যস্ত থাকতেন। হকাররা লঞ্চ ও ফেরিঘাটে ঘুরে ঘুরে নানা জিনিস বিক্রি
করত। এতে তাদের সংসার চলত। ট্রাক-বাস চালকদের আড্ডা, যাত্রীদের কোলাহল, নদী পারাপারের
তাড়া- ঘাটকে প্রাণবন্ত করে রাখত।
কিন্তু স্বপ্নের
পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে নিমিষে সব কিছু বদলে গেছে। আগে ৭টি ফেরিঘাট
দিয়ে দিনে ১৮-২০টি ছোটবড় ফেরি চলাচল করত। উভয় ঘাট মিলে রাতদিন মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন
প্রকারের ১০ হাজার যানবাহন নদী পারাপার হতো।
এখন ফেরিগুলো
অলস সময় কাটাচ্ছে। মাত্র ৭-৮টি ছোটবড় ফেরি দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে সচল রাখা হয়েছে।
এখন ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪ হাজার বিভিন্ন ধরনের যানবাহন নদী পারাপার হয়ে থাকে।
লঞ্চঘাটের চিত্র
আরও করুণ। আগের সেই চিরচেনা চিত্র নেই। লঞ্চঘাটে যাত্রীদের তেমন নেই ভিড়, নেই তেমন
কোলাহল। লাল পোশাক পরা কুলিদের দেখাও মেলে না। হকারদের আনাগোনা অদৃশ্য হয়ে গেছে। ঘাটের
চারপাশে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রীর পসরা সাজিয়ে অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বসে থাকে চিত্র
আর চোখে পড়ে না।
পদ্মা সেতুর ওপর
দিয়ে যানবাহন ও ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে এখন সর্বোচ্চ ৩ হাজার
যাত্রী পারাপার হয়। এই পরিবর্তনের প্রভাবে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটের দুই পাশে জৌলুস
হারিয়েছে। দৌলতদিয়া লঞ্চ ও ফেরিঘাটকেন্দ্রিক অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। হোটেল,
রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল, স্থায়ী ব্যবসায়ীরা লোকসানের কারণে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন।
খালি পড়ে রয়েছে শত শত দোকান। স্থানীয় ব্যবসায়ী শহিদুল মিয়া বলেন, আগে দিন-রাত লাখ টাকার
বেচাবিক্রি হতো। এখন খরচ ওঠানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের
মানুষের স্বপ্ন পূরণ করেছে ঠিকই কিন্তু আমাদের কর্মহীন করে তুলেছে। দীর্ঘদিন চা-বিক্রেতা
সাকাত হোসেন বলেন, আগে দিনে হাজার কাপ চা বিক্রি হতো, এখন ১০০ কাপও বিক্রি হয় না। বাধ্য
হয়ে দোকান বন্ধের কথা ভাবছি। স্কুলশিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, নতুন প্রজন্ম হয়তো কখনও
কল্পনাও করতে পারবে না দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটের একসময়কার ব্যস্ততা ও কোলাহল। তার ভাষায়,
এটা শুধু যাতায়াতের পথ ছিল না, বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ছিল।
গোয়ালন্দের সংবাদপত্র এজেন্ট ও বাংলাদেশ সংবাদপত্র এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন কল্যাণের ভারপ্রাপ্ত
সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম বলেন, আগের মতো পত্রিকা এখন দৌলতদিয়া ঘাটে চলে না। আগে
আমার তিন-চার হকার হাজার পত্রিকা বিক্রি করত, এখন তার চার ভাগের এক ভাগ পত্রিকা চলে
না। প্রায় ২০ বছর ধরে দৌলতদিয়া ঘাটের সঙ্গে কর্মরত সাদেকুর রহমান বলেন, পদ্মা সেতুতে
বাস চালুর পর রেল চালু হওয়ায় ফেরিঘাট আরও অচল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে লঞ্চঘাটের পুরনো
কাঠামো ভেঙে যাচ্ছে।
একসময়ের জাঁকজমক
এখন পরিণত হয়েছে নির্জনতায়। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে হারিয়ে গেল হাজার হাজার মানুষের
জীবিকা। একসময়ের প্রাণবন্ত এই দুই ফেরি ও লঞ্চঘাট এখন কেবল ইতিহাসের অংশ। আর স্মৃতির
পাতায় রয়ে গেছে তাদের জৌলুসময় দিনগুলো। দৌলতদিয়া লঞ্চঘাটের ম্যানেজার নুরুল আনোয়ার
মিলন বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার আগে প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার যাত্রী এই ঘাট দিয়ে
লঞ্চে পদ্মা পার হতো। তখন আমাদের ২২টি লঞ্চ দিয়েও যাত্রী পারাপারে হিমশিম খেতে হতো।
কিন্তু এখন প্রায় সময়ই বেশিরভাগ লঞ্চ বসে থাকে। সেতু চালুর পরও কিছুটা যাত্রী পাওয়া
যেত। তবে সেতুতে রেল চালুর পর থেকে ঘাট একেবারে যাত্রীশূন্য হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এই
ঘাট দিয়ে সর্বোচ্চ এক হাজার থেকে দেড় হাজার যাত্রী পারাপার হয়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ
নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক সালাউদ্দিন
বলেন, সেতু চালু হওয়ার আগে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টায় শুধু দৌলতদিয়া ঘাট প্রান্ত দিয়েই ৫ হাজারেরও
বেশি যানবাহন পারাপার করা হতো। তখন ঘাট এলাকায় সব সময়ই যানবাহনের দীর্ঘ সিরিয়াল থাকত।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সব ফেরি সচল থাকলেও এখন ঘাটে গাড়ির জন্য ফেরিকে অপেক্ষায় থাকতে
হয়। ফলে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আর আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য নেই।