সুনামগঞ্জ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:০২ পিএম
আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:০৩ পিএম
সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতাল দালাল ও মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রম হয়ে উঠেছে- যা স্বাস্থ্যসেবার মানকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দালালদের অপতৎপরতা এতটাই বেশি যে, তারা এখন সরাসরি চিকিৎসকদের কাজে হস্তক্ষেপ করে জটিল রোগীদের ভুল চিকিৎসা দিচ্ছে। এভাবে অসহায় রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
এমনকি এই দালালচক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলেই হামলার শিকার
হতে হচ্ছে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের। গত এক মাসে তিনটি গুরুতর হামলার ঘটনা ঘটলেও,
হাসপাতাল বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দালাল বা হামলাকারীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা
নেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাবে আপস- দফারফা করছে হাসপাতাল প্রশাসন।
সোমবার (২৪ নভেম্বর) একজন সিনিয়র স্টাফ নার্সের ওপর হামলার প্রতিবাদে হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা এমন অভিযোগ করেন। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, যখনই কোনো জটিল বা গুরুতর অসুস্থ রোগী সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসেন, কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাদের প্রাথমিক পরীক্ষার পর অবস্থার অবনতি বা উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বুঝে দ্রুত সিলেটে রেফার করেন। দালালচক্র এই রেফার করার সুযোগটিকেই কাজে লাগায়। তারা রোগীর স্বজনদের বোঝাতে শুরু করে, এত দূরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তারা কম খরচে এবং দ্রুত এই হাসপাতালেই উন্নত চিকিৎসা করিয়ে দিতে পারবে। চিকিৎসকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে, দালালরা রোগীদের ভুল চিকিৎসার দিকে ঠেলে দেয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিভিন্ন ডায়াগনিস্ট সেন্টারে নিয়ে যায়। এর বিনিময়ে তারা রোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। দালালদের এই ভুল চিকিৎসায় রোগীর অবস্থা ভালো হওয়ার পরিবর্তে আরও খারাপ হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সরা যখন এই অবৈধ কর্মকাণ্ড ও অপচিকিৎসার প্রতিবাদ করেন, তখনই তারা দালালদের রোষানলে পড়েন। গত এক মাসে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর দালালদের হামলার তিনটি বড় ঘটনা ঘটেছে।
মেডিকেল টেকনেশিয়ান (ইকু) রোমান মিয়া বলেন, একের পর এক এরকম ঘটনা ঘটছে, কোনো বিচার পাচ্ছি না। আমাদের নিরাপত্তাই যদি না থাকে তাহলে ভালো সেবা কীভাবে দেব আমরা। তিনি বলেন, হাসপাতাল এলাকা মাদকসেবীদের সুরক্ষা স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্ধ্যার পরে হাসপাতালের অনেক জায়গায় মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। এরকম কাজের প্রতিবাদ করলে আমাদের হুমকি দেওয়া হয়। অনেকে হাসপাতালকে নিজের সম্পত্তি মনে করে অনাকাঙ্কিত ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। এর প্রতিকার চান তারা ।
মেডিকেল টেকনিশিয়ান (ইসিজি) সাদিক আহমেদ বলেন, ‘আমাদের স্যারেরা
(ডাক্তার) যে রোগীদের সিলেট রেফার করেন, সে রোগীদেরও দালালরা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে প্লাস্টার
করে। যেসব রোগী রগ (টেনডর) কাটা থাকে। রগ জোড়া
না লাগিয়ে প্লাস্টার করলে অনেক বড় ক্ষতি হতে পারে। এমন জরুরি রোগীদেরও দালালরা ড্রেসিং
করে, সেলাই করে। এতে রোগীর ক্ষতিসহ আমাদের স্যারদের সম্মানহানির আশঙ্কা প্রতিনিয়ত।
প্রায়ই এক্স-রে করার সময় দেখি প্লাস্টার করা থাকে। এই প্লাস্টার করার কথা একজন দক্ষ
ব্যক্তি। কিন্তু দালালরা টাকা নিয়ে ভাঙা হাড় ঠিক না করে প্লাস্টার করে দিয়ে দেয়। এভাবে
অসংখ্য মানুষ দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। হাত-পা অকেজো হয়ে যাচ্ছে। এধরনের
ঘটনা কর্তৃপক্ষকে বারবার অবগত করেও সমাধান হচ্ছে না। অপচিকিৎসা চলছেই।
জরুরি বিভাগের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স মো. মোস্তাফিজুর রহমান
বলেন, হাসপাতালের আশপাশে দালাল চক্র ওঁতপেতে বসে থাকে চিকিৎসক নার্সদের লাঞ্চিত করার
জন্য। সুনামগঞ্জবাসীকে জানাই, ভালো সেবা পেতে হলে দালালদের পক্ষে কোনো অনুরোধ নিয়ে
আসবেন না দয়া করে। দালালরা পুরো হাসপাতালকে জিম্মি করে রেখেছে। অনেক রোগী রয়েছেন সাধারণ
ওষুধ কেনার ক্ষমতা নেই। এমন রোগীদেরও দালালরা জিম্মি করে এক থেকে দুই হাজার টাকা হাতিয়ে
নিচ্ছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক চিণ্ময় সাহা পোদ্দার বলেন, গত এক
মাসে ৩টি খারাপ ঘটনা ঘটেছে। প্রথমে আমাদের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের ওপর হামলা করা হয়।
এক সপ্তাহ আগে আরেক কর্মচারীর ওপর হামলা হয়েছে, গত রবিবার জরুরি বিভাগে এক সিনিয়র স্টাফ
নার্সের ওপর হামলা করা হয়। হাসপাতাল থেকে দালাল নির্মূলের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি।
তবে, কোনোভাবেই নির্মূল করা যাচ্ছে না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানালেও কিছুদিন
পর পর দালালরা চলে আসে। তারা রোগীদের নিয়ে টানা হেঁচড়া করে। মারাত্মকভাবে রোগীদের ক্ষতি
করার চেষ্টা করে। আমরা যখন কোনো রোগীকে পরীক্ষার জন্য পরামর্শ দিই তখন দালালরা রোগীদের
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়। এমনকি তাদের সুবিধামতো কাজ করার চেষ্টা করে। এভাবে রোগীদের
কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে অর্থ হাতিয়ে নিতে পারে। বারবার এবিষয়ে কথা বললেও কোনো কার্যকর
পদক্ষেপ নেয়নি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন, অন্যায় যদি প্রশ্রয় দেওয়া হয় সেটি বাড়তে
থাকে। এরই পরিক্রমায় ধীরে ধীরে সমস্যাগুলো বেড়েছে। প্রথম দিনই যদি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া
হতো তাহলে আজকে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সদস্য আমাদের সেবার জন্য হাসপাতালে
আসেন। আমাদের সেবার মান ভালো নয় তারা বলতে পারবেন না। তবে, আমাদের ওপর হামলা হয় এটি
এতবার বলার পরেও কেন দালালদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। অন্য কোনো
সরকারি অফিসের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তার ওপর হামলা হলে আপনারা কী চুপ
থাকতেন? জানি থাকতেন না, তাই দয়া করে হাসপাতালের দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ
করুন। কারণ রোগীর সুস্থতার জন্য আমাদের আন্তরিকতার প্রয়োজন। এভাবে হামলা করলে ভেতর
থেকে আর আন্তরিকতা আসবে না।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দ বলেন, হাসপাতালে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করার জন্য জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। তবে কার্যকর কিছু দেখিনি। রবিবার সিনিয়র নার্সের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এক্স-রে রুমের হামলার ঘটনায় তত্ত্বাবধায়ক ও কিছু রাজনৈতিক নেতার উপস্থিতিতে মুচলেকা দিয়েই শেষ করা হয়েছে। কিন্তু মুচলেকা দিয়ে এসব ঘটনার সমাধান হয় না। কয়েকদিন পর এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। আসলে আমরা তাই দেখছি। আমরা সুযোগ দেই, মানুষ সুযোগের অপব্যবহার করছে।
এছাড়াও মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন সহকারী অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, শিশু বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. এনামুল হক খান, মেডিসিন বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. জহরলাল দাস শিপলু, মেডিকেল টেকনিশিয়ান (ডায়ালাইসিস) জুবায়ের হোসেন প্রমুখ।
এবিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, গত মাসে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা ছিল। সভায় জেলা প্রশাসকসহ পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। দালালদের উৎপাত নিয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে। একটি তালিকাও দিয়েছি। তবে, কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। স্থানীয় হওয়ায় দালালচক্র খুবই শক্তিশালী। আমরা আশা করব, প্রশাসন দ্রুত এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।