ভূমিকম্প
আহমদ মারুফ, সিলেট
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২৫ ১৫:১২ পিএম
আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২৫ ১৫:২০ পিএম
সিলেট নগরী। ছবি : সংগৃহীত
ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা সিলেট নগরীর ২৩টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। শুক্রবার (২১ নভেম্বর) ও শনিবার (২২ নভেম্বর) কয়েকদফা ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে আতংকের মধ্যে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম।
প্রায় ছয় বছর আগে সিলেট নগরের ওই ২৩টি ভবনকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। এগুলো ভেঙে ফেলারও পরামর্শ দিয়েছিলেন তারা। এতোদিন এসব ভবনের ব্যাপারে নির্বিকার ছিল সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)।
জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানিয়েছেন, ‘সিলেট নগরীর ২৩টি বিপজ্জনক ভবন ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেগুলো খুব শীঘ্রই ভেঙে ফেলা হবে। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বেশ কয়েকটি ভবন রয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকেই অপসারণের কাজ শুরু হবে।’
সারওয়ার আলম বলেন, ‘চিহ্নিত ভবনগুলোতে এখনো কেউ কেউ বসবাস করছে বা কাজ করছে। দ্রুত অপসারণ না করলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। নাগরিকদের সুরক্ষার জন্যই আমরা জরুরি ভিত্তিতে ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশাসন ইতোমধ্যে একাধিক ওয়ার্কশপ করেছে। তবে উদ্ধারকাজে প্রধান সমস্যা হচ্ছে সংকীর্ণ রাস্তা, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে না পারলে রেসকিউ কার্যক্রম ব্যাহত হবে।’
সিসিকের তালিকা অনুযায়ী নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো হলো- কালেক্টরেট ভবন-৩, সমবায় ব্যাংক ভবন মার্কেট, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার সাবেক কার্যালয় ভবন, সুরমা মার্কেট, বন্দর বাজার এলাকার সিটি সুপার মার্কেট, মিতালী ম্যানশন, দরগা গেইটের আজমীর হোটেল, মধুবন মার্কেট, কালাশীল এলাকার মান্নান ভিউ, শেখঘাটের শুভেচ্ছা-২২৬, চৌকিদেখী এলাকার ৫১/৩ সরকার ভবন, যতরপুরের নবপুষ্প-২৬/এ, জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশন, পুরানলেন এলাকার ৪/এ কিবরিয়া লজ, খারপাড়ার মিতালী-৭৪, মির্জাজাঙ্গালের মেঘনা-এ-৩৯/২, পাঠানটুলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বাগবাড়ী এলাকার ওয়ারিছ মঞ্জিল একতা- ৩৭৭/৭, হোসেইন মঞ্জিল একতা- ৩৭৭/৮ ও শাহনাজ রিয়াজ ভিলা একতা- ৩৭৭/৯, বনকলাপাড়া এলাকার নূরানী-১৪, ধোপাদিঘী দক্ষিনপাড়ের পৌর বিপনী ও পৌর শপিং সেন্টার, এবং পূর্ব পীরমহল্লার লেচুবাগান এলাকার ৬২/বি- প্রভাতী, শ্রীধরা হাউস।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা নিয়ে গঠিত তৃতীয় জোনেই সিলেটের অবস্থান। প্রায় ১ কোটি লোকের বাস এখানে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শুধু সিলেট নগরীর ৭ শতাংশ ঘরবাড়ি নির্মাণ হয়েছে অনুমোদন ছাড়াই। কোনো পরিকল্পনা ও অনুমোদন ব্যতীত ঘরবাড়ি নির্মাণ হয়েছে ৯ শতাংশ। সবচেয়ে মারাত্মক হলো- ৪০ শতাংশ ঘরবাড়ি নির্মাণ হয়েছে মাটি পরীক্ষা ছাড়াই।
প্রকৌশলীদের মতে, সিলেটে এ পর্যন্ত নির্মিত ভবনগুলোর ৪০ ভাগ ৬ থেকে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারবে। ৪৪ ভাগ ৫ থেকে ৫ দশমিক ৯ মাত্রার পর্যন্ত ঝুঁকি গ্রহণ করতে পারবে। বাকি ভবনগুলোর ভূমিকম্প মোকাবিলার কোনো ব্যবস্থা নেই।
উদ্বেগজনক তথ্য হচ্ছে, ভূমিকম্প চলাকালীন প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস কিংবা দ্রুত উদ্ধার কাজ চালানোর জন্য সিলেটে কোনো ব্যবস্থা নেই। উপরন্তু প্রতিযোগিতামূলক বহুতল প্রাসাদ-দালান-অট্টালিকা নির্মাণ হচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে।
জানা যায়, ২০১৯ সালে কয়েকদফা ভূমিকম্পের পর ঝুঁকি মোকবেলায় সিলেট নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলা, সব বহুতল ভবনের ভূমিকম্পসহনীয়তা পরীক্ষাসহ কিছু উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন। এ সময়ে নগরের প্রায় ৪২ হাজার বহুতভবন পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছিল সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। কিন্তু অর্থ সংকটে সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি। তবে অনেক পুরনো কয়েকটি ভবন বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষার পর নগরের ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রকাশ করে সিসিক।
ওইদিনই নগরের সুরমা মার্কেট, সিটি সুপার মার্কেট, মধুবন সুপার মার্কেট, সমবায় মার্কেট, মিতালী ম্যানশ্যান ও রাজা ম্যানশন নামের ৭টি বিপনী বিতানকে ১০ দিন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। আর নির্ধারিত ১০ দিন পর কোনো সংস্কার ছাড়াই খুলে দেওয়া হয় বন্ধ করা ভবনগুলো। এখনো এগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে।
জানা যায়, ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকা চারটি ভবনকে অপসারণ এবং আরও দুইটি ভবনকে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা সংস্কার করা হয়। এরপর দীর্ঘ ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও বাকি স্থাপনাগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সিসিক। এসব স্থাপনার মধ্যে বাসাবাড়ি, বিদ্যালয় এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। নগর প্রশাসনের এমন দুর্বলতাকে পুঁজি করে উল্টো খোলস পাল্টে ফেলা হয়েছে এসব স্থাপনার।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সিলেটে যেকোনো সময় বড় ধরণের ভূমিকম্প হতে পারে। এতে ধ্বসে পড়তে পারে বেশিরভাগ বহুতল ভবন। তাই বহুতল ভবনগুলো ভেঙে ফেলা এবং নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ও এনভায়রনমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে সিলেটের অধিকাংশ স্থাপনাই উচ্চ মাত্রার ভূ-কম্পন সহ্য করতে সক্ষম নয়। সিলেট শহরে প্রায় ৪২ হাজার ভবন রয়েছে। এসবের বেশিরভাগই পুরনো ও দুর্বল, যেগুলো মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেই ধ্বসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ভূমিকম্প হলে এ অঞ্চলে বিপুল প্রাণহানি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।’
অধ্যাপক মুশতাক বলেন, ‘পুরোপুরিভাবে ভূমিকম্প মোকাবেলা সম্ভব না করা গেলেও, আগে থেকে কিছু সতর্কতা অবলম্বন এবং পদক্ষেপ নিলে এর তীব্র ক্ষয়ক্ষতি থেকে কিছুটা বাঁচা যাবে।’
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, ‘সিলেট মহানগরীতে যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো রয়েছে সেই ভবনগুলোর সংস্কার কার্যক্রমের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমরা খুব শিগগিরই একটি পদক্ষেপ নেব। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিষয়ে একটি কমিটি আছে, তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।’