রাসেল আহমদ, মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:২৬ পিএম
মহামান্য হাইকোর্টের রায় অমান্য করে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার আন্তঃসীমান্ত নদী যাদুকাটায় ‘শেইপ মেশিন’ দিয়ে নদীর পাড় কেটে বালু লুটপাটকে কেন্দ্র করে স্থানীয় লাউড়েরগড় ও ডলারপাড় গ্রামের বালুখেকো চক্রের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলছে। যাদুকাটা নদীর তীরবর্তী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
জানা গেছে, তাহিরপুর সীমান্তের বৃহৎ বালুমহাল যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ এ বছর ১০৭ কোটি টাকায় ইজারা নেন শাহ রুবেল ও নাছির মিয়া নামের দুজন ইজারাদার। আদালতে মামলা থাকায় দরপত্র গ্রহণের পর প্রায় তিন মাসের বেশি সময় পাড় না কাটা, ড্রেজার ও বোমা মেশিন ব্যবহার না করা এবং পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম না চালানোর শর্তে আদালতের আদেশে তাদের কাছ থেকে রাজস্ব গ্রহণ করে জেলা প্রশাসন। এরপর ইজারাদারেরা রয়েলটি আদায় শুরু করেন। গেল ৮ নভেম্বর থেকে চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই আলোচিত এ সীমান্ত নদীতে পাড় কেটে অন্তত ১০০ কোটি টাকার বালু লুট হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ৮ নভেম্বর রাত ১২টার পর হঠাৎ দুই থেকে আড়াই হাজার বাল্কহেড যাদুকাটায় প্রবেশ করে। প্রতিটি বাল্কহেডে ১০-১৫ জন শ্রমিক ছিল। দেখে মনে হয়েছে, আগেই পরিকল্পনা করে তারা একযোগে নদীতে নেমেছে। তারা বিজিবির লাউড়েরগড় ক্যাম্পের কাছে থেকে নদীর পাড়ের সাহিদাবাদ পর্যন্ত লাগাতার চারদিন দিন-রাত পাড় কেটে চলে। ঘটনাটি এতটাই আকস্মিক ছিল যে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিও হতভম্ব হয়ে পড়ে। বিজিবির পক্ষ থেকে বালু লুট শুরুর একদিন পর জেলা প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হয়।
এরপর টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান পরিচালনার কথা জানায় জেলা প্রশাসন। পরবর্তীতে প্রতিদিন তিন পর্বে তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের একাংশ এ দাবিকে ‘নাটকীয়’ এবং ‘পাতানো অভিযান’ বলে অভিযোগ করেছেন। তাদের মতে, প্রতিদিনই দেড় থেকে দুই হাজার খননযন্ত্র বা শেইপ মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে দিন-রাত নদীর পাড় কাটা চলছে।
গত ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক জানান, গেল দুদিনে আরও চারটি অভিযান হয়েছে যাদুকাটায়। অর্থাৎ ৩০ দিনে মোট ৫৭টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
এদিকে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে খুরশেদ আলমের দায়ের করা পিটিশনে উল্লেখ করা হয়, হাইকোর্ট বিভাগের ২০২৪ সালের ৯৯১৭ নম্বর রিট পিটিশনে ১৯ আগস্টের প্রদত্ত আদেশ ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করায় বিবাদীদের বিরুদ্ধে অবমাননার মামলা রুজুর আবেদন দাখিল করা হয়েছে।
পিটিশনে বলা হয়, স্থানীয় দুর্বৃত্তরা লিজগ্রহীতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিষিদ্ধ এলাকা থেকে ড্রেজার মেশিন, বাল্কহেড ও শেইপ মেশিনের সাহায্যে অবৈধভাবে পাথর-মিশ্রিত বালু উত্তোলন করে আসছে, যা বালু খনি ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (২০২৩ সাল পর্যন্ত সংশোধিত)-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আইনজীবী ব্যারিস্টার উজ্জ্বল হোসেন বলেন, ‘আমরা আদালতকে বলেছি, প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় পাড় কাটা চলছে। দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতায় আদালতের আদেশ প্রতিপালিত হয়নি।’
পিটিশনে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া, পুলিশ সুপার তোফায়েল আহম্মেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সমর কুমার পাল, রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর সোয়াদ সান্ডার চৌধুরী, তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেরিনা দেবনাথ, সুনামগঞ্জ সদরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার চাতক চাকমা, তাহিরপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার প্রণয় রায়, তাহিরপুরের এসিল্যান্ড শাহরুখ আলম শাজলু, বিশ্বম্ভরপুরে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত এসিল্যান্ড মেরিনা দেবনাথ, তাহিরপুরের ওসি দেলোয়ার হোসেন এবং বিশ্বম্ভরপুরের ওসি মুখলেছুর রহমানকে বিবাদী করা হয়েছে।
আবেদনকারী খোরশেদ আলম বলেন, ‘বালুমহালের ইজারাদার ২৪ গণঅভ্যুত্থানবিরোধী খুনের মামলার আসামি ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের চিহ্নিত ক্যাডার। তার লোকেরা আমাকে হুমকি দিয়ে বলছেÑ যাদুকাটা নদীতে যা হচ্ছে তা চলমান থাকবে। কেউ বন্ধ করতে পারবে না। কারণ দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টায় লুটেরাদের পক্ষ থেকে সুনামগঞ্জের ডিসি, এসপি, তাহিরপুরের ইউএনও এবং এসিল্যান্ডকে ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এলাকাবাসী যেকোনো মূল্যে যাদুকাটা নদী ও তীরবর্তী গ্রামগুলোকে রক্ষা করতে চাই। এখানে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। হাইকোর্টের রায় অমান্য করে নিষিদ্ধ শেইপ মেশিন দিয়ে যাদুকাটা নদীর পাড় কেটে বালু লুটপাটের সঙ্গে জড়িত সুনামগঞ্জের ডিসি, তাহিরপুর ইউএনও, এসিল্যান্ড, ওসির বিরুদ্ধে আগামীকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন হবে।
ঢাকায় বসবাসরত তাহিরপুর উপজেলার সর্বস্তরের জনগণকে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করছি।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াছ মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, যাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলন বা লুটপাটকে কেন্দ্র করে কোনো সংঘর্ষ বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছেÑ এমন কোনো তথ্য তাকে কেউ জানায়নি। এসপির সঙ্গেও কথা বলেছেন উল্লেখ করে জানান, এসপিও এ ধরনের ঘটনা শোনেননি।
নিজের বিরুদ্ধে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে লুটেরাদের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যারা এসব অভিযোগ করছে, তাদের কথা শুনলেই তো হবে না। আপনারা তদন্ত করে দেখুন, অভিযোগের কতটুকু সত্য।’ তিনি জানান, হাইকোর্টের নোটিস তিনি পেয়েছেন এবং এর জবাবও দিয়েছেন।