× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

২৯ জেলে পরিবারে চলছে আহাজারি

ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ, মহেশখালী (কক্সবাজার)

প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ২১:১১ পিএম

 ভারতে আটক মহেশখালীর জেলেদের পরিবারে আহাজারি চলছে। প্রবা ফটো

ভারতে আটক মহেশখালীর জেলেদের পরিবারে আহাজারি চলছে। প্রবা ফটো

উপকূলীয় জনপদ মহেশখালীর ধলঘাটা। নোনা বাতাস আর সমুদ্রের গর্জনের সাথে এখন এই জনপদে মিশে গেছে স্বজন হারানো মানুষের দীর্ঘশ্বাস, হতাশা আর শূন্যতা। স্থানীয় জেলে জসিম উদ্দিনের ঘরে উঁকি দিলেই চোখে পড়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য, যেখানে ছয় সন্তান আর অসহায় স্ত্রী প্রতিদিন তাকিয়ে থাকেন বাড়ির কর্তার ফেরার আশায়। কিন্তু জসিম উদ্দিন এখন আর বাড়ির আঙিনায় নেই, নেই সাগরের বুকেও। তিনি আজ ভিনদেশি কারাগারে বন্দি, অজানা অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিঃসঙ্গ সময় পার করছেন।

শুধু জসিম নন, তার মতো একই পরিণতি বরণ করেছেন জাহাঙ্গীর মাঝি, আবু বক্কর, পারভেজ ও সৈয়দ আহমদসহ ধলঘাটা এলাকার মোট ২৯ জন মৎস্যজীবী। যে পরিবারগুলো একসময় স্বাভাবিকভাবে দিন কাটাত, সেখানে এখন চলছে শোকের মাতম আর অস্থির প্রতীক্ষা। স্বজনহারা এই পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার ঘন ছায়া, খাবার জোটাতে হিমশিম খাচ্ছে অনেকেই। তাদের প্রতিটি ঘরেই আজ কান্না আর শোকের দীর্ঘশ্বাস, যেন পুরো ধলঘাটা পরিণত হয়েছে এক নীরব শোকস্তব্ধ জনপদে।

জীবিকার তাগিদ মানুষকে কোথায় না নিয়ে যায়। ধলঘাটার মানুষদের মূল পেশা ছিল লবণ চাষ, কিন্তু কয়েক বছরের বাজার অস্থিরতায় ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তারা পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে বেঁচে থাকার লড়াই মানুষকে বাধ্য করে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে, তাই তারা বেছে নেন সমুদ্রের ঝুঁকিপূর্ণ গভীর জলরাশিকে। উপকূলের কাছাকাছি মাছ ধরায় লাভ কম হওয়ায় তারা দূর সমুদ্রে পাড়ি জমান। কে জানত নিয়তির এই যাত্রা তাদের এমন ভয়ংকর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে।

গত ১৩ নভেম্বর এমভি আমেনা গনি নামে ট্রলারটি ২৯ জন মাঝিমাল্লাকে নিয়ে স্বপ্ন আর আশায় ভর করে সাগরে নামে। কিন্তু প্রকৃতির আচরণ কখনোই পুরোপুরি অনুমান করা যায় না। শীতের ঘন কুয়াশায় দিকভ্রান্ত হয়ে ট্রলারটি অজান্তেই সীমানা অতিক্রম করে ভারতীয় জলসীমায় পৌঁছে যায়। ১৫ নভেম্বর রাতে ভারতীয় কোস্টগার্ড তাদের আটক করে নিয়ে যায়। ট্রলার মালিক বলছেন, এটি ছিল নিছক দুর্ঘটনা এবং কোন অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না তাদের, ঘটনার শিকার ছিলেন সবাই।

ট্রলার মালিকের দাবি অনুযায়ী ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ দুর্ঘটনা, কোনোভাবেই ইচ্ছাকৃত সীমানা লঙ্ঘন নয়। আটক হওয়া মাঝিমাল্লাদের মধ্যে রয়েছে মাত্র ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরও, যে বয়সে তার বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল, অথচ দারিদ্র্যের তাড়নায় এখন সে ভিনদেশে বন্দি জীবন কাটাচ্ছে। স্বজনদের অভিযোগ, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষগুলো আটক হওয়ায় ধলঘাটার ঘরে ঘরে চুলা জ্বলা দায় হয়ে পড়েছে। শিশু ও নারীদের দিন কাটছে অনাহারে, দুশ্চিন্তায় ক্লান্ত।

ধলঘাটার এসব পরিবার বলছেন তারা কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেননি। প্রিয়জনদের আটক হওয়ার পর পুরো এলাকা যেন শোকে নিমজ্জিত। আবার কবে স্বাভাবিক জীবন ফিরবে তা কেউ জানেন না। স্বজনরা সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে আটক ব্যক্তিদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে। তাদের ভাষায় যদি এই মানুষগুলো ফিরতে দেরি হয় তবে অনেক পরিবার পথে বসে যাবে। তাই সরকারের প্রতি তাদের আকুতি মানবিক দৃষ্টিতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন অবশ্য এই অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল আলম জানিয়েছেন যে বন্দি জেলেদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তিনি বলেছেন প্রশাসন পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং পরিবারগুলোকে একা অনুভব করতে দেওয়া হবে না। এই মানবিক সংকট সমাধানে সব ধরনের সহায়তা ও আইনি সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

সরকারি এই আশ্বাসে ভরসা রেখে এখন ধলঘাটার ২৯টি পরিবারের সদস্যরা বুক বাঁধছেন নতুন প্রত্যাশায়। তাদের প্রতিটি দিন কাটে অপেক্ষার প্রহরে, কখন তাদের প্রিয় মানুষগুলো ঘরে ফিরবে। সন্তানরা প্রতিদিন দরজার দিকে চেয়ে থাকে, মায়েরা চোখের পানি লুকিয়ে প্রার্থনা করেন প্রিয়জনের নিরাপদ ফেরার জন্য। ধলঘাটার মানুষের আশা, কুয়াশা কাটলেই যেমন দিগন্ত পরিষ্কার দেখা যায়, তেমনি একদিন কাটবে এই দুঃসময়ও এবং তারা ফিরে পাবেন স্বজনের উষ্ণ উপস্থিতি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা