রাসেল আহমদ, মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২৮ এএম
আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৩১ এএম
সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের আলমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণি কক্ষ। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
সুনামগঞ্জ জেলার হাওরবেষ্টিত মধ্যনগর উপজেলার বিশাল অংশ আজও প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের মোট ১৪৭টি গ্রামের মধ্যে ৬৩টি গ্রামেই নেই কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ফলে এসব গ্রামের দুই সহস্রাধিক কোমলমতি শিশু প্রাথমিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, মধ্যনগরে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮৪টি। এসব বিদ্যালয়ে ১১ হাজার ৬১৯ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ হাজার ৭৫০ জন ছাত্র ও ৫ হাজার ৯১৯ জন ছাত্রী। এর মধ্যে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার ১১.০৫ শতাংশ। অর্থাৎ সহস্রাধিক শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও নানা কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না।
সূত্র আরও জানায়, উপজেলার ৮৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩৭৮ জন শিক্ষক আছেন। শূন্য আছে প্রধান শিক্ষকের ৩২টি ও সহকারী শিক্ষকের ৬০টি পদ। আর উপজেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক, একাডেমিক ও ব্যবস্থাপনাগত কার্যক্রম তদারকি করতে বা সামগ্রিকভাবে প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে সহায়তা করতে আছেন মাত্র দুজন। তাদের একজন শিক্ষা কর্মকর্তা ও একজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা।
একটি বেসরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপে জানা যায়, উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নে ১৮টি, বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নে ১৭টি, মধ্যনগর ইউনিয়নে ১২টি এবং চামরদানী ইউনিয়নে ১৬টি গ্রামে একটিও বিদ্যালয় নেই। বিদ্যালয় না থাকায় এসব গ্রামগুলোয় দুই সহস্রাধিক শিশু প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
এদিকে ৬৩ গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুর পাশাপাশি বাড়ছে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বিদ্যালয় না থাকা গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও ঝরে পড়া এসব শিক্ষার্থী ক্ষেত-খামারে, স্থানীয় হাট-বাজারের হোটেল-রেঁস্তোরায়, এমনকি হাওরে মাছ ধরার কাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাওর এলাকা ৬-৭ মাসই থাকে জলমগ্ন। গ্রামগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও দূরত্ব বেশি। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের বিদ্যালয়ে যাওয়াটা শিশুদের পক্ষে খুবই কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। এই প্রতিকূল অবস্থার কারণে অভিভাবকরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের হরিণাকান্দি গ্রামের বিল্লাল মিয়া বলেন, গ্রামে প্রাইমারি স্কুল নেই। ইচ্ছা থাকলেও বাচ্চাদের পড়ালেখা করাতে পারছি না। হাওরের মধ্যে থাকি। বেশিরভাগ সময় তো চারদিকে পানি থাকে। ছোট বাচ্চাদের মাইলখানেক দূরের স্কুলে কীভাবে পাঠাই?
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, বিধি অনুযায়ী, দুই হাজার জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ থাকে। কিন্তু মধ্যনগরের অধিকাংশ গ্রাম ছোট ও বিচ্ছিন্ন হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে জনসংখ্যা সেই মানদণ্ডে পড়ে না। তবু অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যালয়বিহীন ৮টি গ্রামে নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, করোনা মহামারির পর থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার বেড়েছে। এ অবস্থায় সব শিক্ষককে দায়িত্ব পালনে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লাল মোহন দাস বলেন, এই মুহূর্তে নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। তবে ভবিষ্যতে সরকার বিদ্যালয় না থাকা গ্রামে নতুন বিদ্যালয় স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করলে, দুর্গম মধ্যনগর উপজেলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সচেতন নাগরিকদের মতে, মধ্যনগরের মতো দুর্গম হাওর এলাকায় জনসংখ্যার শর্ত শিথিল করে প্রতিটি গ্রামেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা জরুরি। এটা করা না গেলে এ অঞ্চলের আগামী প্রজন্মের একটি বড় অংশ অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে থাকবে।