এনায়েতুর রহমান, পটুয়াখালী
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২৪ এএম
আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২৯ এএম
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী চর সাইনবোর্ড এলাকায় সংরক্ষিত বন ও নদীর তীর কেটে বেরি বাঁধ দেওয়া হচ্ছে হচ্ছে। শুক্রবার তোলা। প্রবা ফটো
পটুয়াখালীর উপকূলীয় দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীর বন বিভাগের কাউখালী বিটের আওতাধীন চর সাইনবোর্ড এলাকায় সংরক্ষিত বন ধ্বংস করা হচ্ছে। তরমুজ ক্ষেত তৈরির জন্য বনের গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। দখল করা হচ্ছে নদীর তীরবর্তী ভূমি।
স্থানীয় ভূমি অফিসের কতিপয় কর্মকর্তার মৌখিক অনুমতি নিয়ে তরমুজ মৌসুমে এভাবে উপকূলের বন ও নদীর তীরভূমি দখল হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অবৈধভাবে বন বিভাগের গাছ কাটা ও নদী তীরের ভূমি দখলের অভিযোগ এনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করলেও দখলদাররা থামছে না।
দখলের উদ্দেশ্যে তিনটি ভেকু দিয়ে মাটি কেটে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। বন রক্ষায় উপকূলীয় বন বিভাগ থেকে মাটি কাটা বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়ার পর এখন রাতের অন্ধকারে দখল কার্যক্রম চলছে।
বন বিভাগ, পটুয়াখালী রাঙ্গাবালী কার্যালয় সূত্র জানায়, রাঙ্গাবালীর ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের চর সাইনবোর্ড এলাকায় ২০১০ সালের ৪ এপ্রিল চর সাইনবোর্ড বনের ৪১৫ একর সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা দেয় বন বিভাগ। এ ছাড়া ওই ঘোষণায় এই চরের সঙ্গে যত চর জাগবে তাও বাংলাদেশ সরকারের বন বিভাগের আওতায় থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ গাছ সৃজন করে বনায়ন শুরু করে বন বিভাগ।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, ছইলা-কেওড়া ছাড়াও ওই সংরক্ষিত বনে ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বন বিভাগ ২০ হেক্টর বনে ঝাউ বাগান, ১০ হেক্টর করমজা, ৩০ হেক্টর কেওড়া, গেওড়া ও বাইন গাছ সৃজন করে। এদিকে ১৮ নভেম্বর সেই সংরক্ষিত বনে প্রথমে মাটি কেটে বাঁধ দিয়ে ওই চরের একটি অংশে তরমুজ ক্ষেত তৈরির কাজ শুরু করা হয়েছে। স্থানীয় মানিক মোল্লা নামের এক ব্যক্তি সংরক্ষিক বন ধ্বংস করে তরমুজ ক্ষেত তৈরির কাজ শুরু করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অবৈধ ওই ক্ষেতের চারিদিকে বেড়িবাঁধ দিতে গিয়ে বনের দুই শতাধিক ঝাউ, কেওড়া, গেওড়া ও বাইন গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এই অবস্থায় ১৯ নভেম্বর উপকূলীয় বন বিভাগের লোকজন বন রক্ষায় গাছ ও মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়ে আসে।
বন বিভাগের কাউখালীর বিট কর্মকর্তা মো. জালাল আহমেদ খান জানান, এটি তাদের সংরক্ষিত বন। দখলের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে গেলে দেখা যায় দুটি ভেকু মেশিন দিয়ে গাছ ধ্বংস করে বনের ভেতর দিয়ে বাঁধ দেওয়ার কাজ করছেন স্থানীয় মানিক মোল্লা। ভূমি অফিস থেকে অনুমতি নিয়ে বাঁধ গিয়ে ক্ষেত তৈরি করছেন বলে তিনি জানান।
বন বিভাগ থেকে কাজ বন্ধ করে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে। এ ঘটনার পর ওই রাতেই আরও একটি ভেকু মেশিন চরে নেওয়া হয় এবং রাতভর তিনটি ভেকু দিয়ে মাটি কেটে বাঁধ দেওয়ার কাজ করা হয়েছে। এতে বন বিভাগের প্রায় ৩০ হেক্টর বনভূমির দুই শতাধিক বনের গাছ ধ্বংস হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গত শুক্রবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, চর সাইনবোর্ডে সৃজিত সংরক্ষিত বনের কয়েক একর জায়গা ঘিরে ইতোমধ্যে মাটির বাঁধ দেওয়া হয়েছে। বনের ভেতরে বড় বড় গাছের গুঁড়ি পরে রয়েছে। অনেক গাছ ভেকু দিয়ে উপড়ে ফেলার পর গোড়া মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। রাতের অন্ধকারে বন ধ্বংস করে বাঁধ দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন জানায়।
তবে এ ব্যাপারে মানিক মোল্লা জানান, তারা উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের তহসিলদার জাহিদুল ইসলামের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে চরে তরমুজ ক্ষেত করছেন।
তহসিলদার জাহিদুল ইসলাম এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাননি। তবে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অবহিত আছেন বলে জানান তিনি।
এদিকে সংরক্ষিত বনের জায়গা দখল করে তরমুজ ক্ষেত তৈরির ব্যাপারে উপকূলীয় বন বিভাগের পক্ষে রাঙ্গাবালীর রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিষয়টি জানার পর গত বুধবার সরেজমিন গিয়ে সব কাজ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। ওই দিনই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর বনের ভূমি দখলের বিষয়টি জানিয়েছেন। সংরক্ষিত বনের গেজেটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে চাইলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, সংরক্ষিত বনে কোনো ধরনের ক্ষতি হতে দেওয়া যাবে না। যারা বন ধ্বংস করার উদ্যোগ নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজীব দাস পুরকায়স্ত বলেন, আসলে বিষয়টি আমি জানতাম না। বন বিভাগ তাদের বনের অনুকূলে গেজেটসহ প্রয়োজনীয় কাগজ দিয়ে গেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।