প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ০০:৩৭ এএম
প্রতিদিনের মতো
ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে এসেছে নতুন দিন। শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জের মানুষ নিত্যদিনের
মতোই ছিলেন কর্মচাঞ্চল্যে ব্যস্ত। ছুটির দিন হওয়ায় রাজধানীর অনেক বাসিন্দাই ছিলেন বাসাবাড়িতে।
গৃহিণীরা রান্না-বান্না ও পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, পুরুষরা কেউ ছিলেন বাজারে,
কেউ নিচ্ছিলেন জুমার নামাজের প্রস্তুতি। তবে কর্মজীবীরা যথারীতি নেমে পড়েছিলেন নিজ
নিজ কাজে।
শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটÑ খুবই স্বাভাবিক ও দৈনন্দিন একটি সময়। ঠিক সেই মুহূর্তেই আকস্মিক
তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে পুরো দেশ। অনুভূত হয় রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প।
মাত্র ২৬ সেকেন্ডের কম্পন মানুষের মনে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন
এলাকার মানুষ জানিয়েছেন, প্রথমে যেন ঘরের ফ্যান দুলে ওঠে, এরপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে
আলমারি-শোকেসের কাচ কাঁপতে থাকে। কেউ ভেবেছিলেন মাথা ঘুরছে, কিন্তু মুহূর্তেই টের পানÑ
এটা ভূমিকম্প। সেই উপলব্ধি হতেই চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়; অনেকে দৌড়ে নামেন সিঁড়ি
বেয়ে। বহুতল ভবনের বাসিন্দারা হুড়োহুড়ি করে বাইরে বেরোতে গিয়ে কেউ কেউ পড়ে যান, ছোটখাটো
আঘাতও পান।
রাজধানীর পুরান
ঢাকার শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ী, গেণ্ডারিয়া, সূত্রাপুর, কোতোয়ালি, লালবাগÑ প্রায় সব এলাকাতেই
মানুষকে দলে দলে রাস্তায় নেমে আসতে দেখা যায়। ভবন ধস না হলেও পুরান ঢাকার বংশালের কসাইটুলিতে
ছয়তলা ভবনের রেলিং ধসে তিনজন পথচারী মারা যান। আহত হন আরও ১০ পথচারী। শহরের বেশ কিছু
ভবনে দেয়াল ও স্তম্ভে ফাটল দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এই ভূমিকম্পে সারা দেশে
অন্তত ১০ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ২ জন শিশু। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় আহত হয়েছেন কয়েকশ
মানুষ।
এদিকে শহরের বিভিন্ন
বহুতল ভবনের সামনে এক ধরনের সমবেত আতঙ্ক তৈরি হয়। প্রাণে বাঁচার তাগিদে অনেকে দিগ্বিদিক
ছুটতে থাকেন। শিশুদের কোলে নিয়ে মা-বাবারা বাইরে ছুটে আসেন; বৃদ্ধ, নারী ও রোগীরাও
কোনোভাবে বিল্ডিংয়ের নিচে নেমে নিরাপদ স্থানে দাঁড়ান। ভূমিকম্পের সময় বেশ কয়েকজন লিফটে
আটকাও পড়েন।
উত্তরা, বাড্ডা,
মগবাজার, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বনানী, গুলশান ও দক্ষিণখান এলাকাÑ সবখানেই
তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। মিরপুর-৬-এর বাসিন্দা সুলতানা বেগম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন,
‘ভূমিকম্পের সময় আমাদের পুরো পাড়া রাস্তায় নেমে আসে। সবাই আতঙ্কিত ছিল, তবে কোনো ক্ষতি
হয়নি।’ তবে দক্ষিণখানের একটি খাবার হোটেলে গরম তেলের কড়াই পড়ে দুই শ্রমিক সামান্য আহত
হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
কম্পন থেমে যেতেই
শুরু হয় আরেক দফা ব্যস্ততাÑ মোবাইল ফোন ধরা। সারা দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে তখন চাপ
বেড়ে যায়। অনেকে ফোন করতে গিয়ে ‘ব্যস্ত’ অথবা ‘নেটওয়ার্ক ত্রুটি’ বার্তা পান। এতে আতঙ্ক
আরও বাড়ে। সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত স্ট্যাটাস দিয়ে অনেকে জানানÑ ‘আমি ভালো আছি’, ‘সবাই
ঠিক আছেন তো?’ কেউ কেউ আবার ভিডিওতে চলমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
মগবাজারের একটি
অফিস ভবন থেকে বের হওয়া কর্মচারী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘জীবনে এমন দুলুনি আগে অনুভব
করিনি। কয়েক সেকেন্ড মনে হয়েছে যেন কয়েক মিনিট। বাইরে এসেই প্রথম মাকে ফোন করেছিÑ উনি
গ্রামে থাকেন, ভয় পেয়েছেন কি না তাই জানতে।’
ধানমন্ডির বাসিন্দা
সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘আমার ভাই চট্টগ্রামে থাকেÑ ভূমিকম্পের পর বারবার ফোন করেছি।
ফোন ধরছিল না। মনে হচ্ছিল কিছু একটা হয়েছে। পরে জানিয়েছেন নিরাপদে আছে।’
দিনভর মানুষের
মধ্যে ভূমিকম্প নিয়ে আলোচনা চলতে থাকেÑ কে কোথায় ছিলেন, কীভাবে অনুভব করেছেন, তখন পরিবারের
সদস্যরা কী অবস্থায় ছিলেন ইত্যাদি। মোবাইল ফোনে ভিডিও কলে দূরের স্বজনদের দেখে অনেকেই
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।
শেষ পর্যন্ত দিনটি
বড় কোনো বিপর্যয় ছাড়াই কেটে গেছে। কিন্তু ১৬ সেকেন্ডের সেই তীব্র দুলুনি সবাইকে আবারও
মনে করিয়ে দিয়েছেÑ ভূমিকম্প কোনো দূরের দুর্যোগ নয়; বরং প্রতিদিনের জীবনের মাঝেই তার
অদৃশ্য উপস্থিতি রয়েছে। আর প্রতিটি কম্পন থেমে যাওয়ার পর মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়াই
থাকেÑ স্বজনের খোঁজ নেওয়া। কারণ আতঙ্কের মুহূর্তে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পরিবার,
তার সম্পর্ক, তার ভালোবাসা।
শুধু ঢাকা নয়,
টাঙ্গাইল, শরীয়তপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহীÑ সব জায়গায় মানুষ
একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।