নরসিংদী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৫ ২০:৫০ পিএম
আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২৫ ২০:৫১ পিএম
নরসিংদীতে তীব্র ভূমিকম্পে ৫ জন নিহত ও আহত হয়েছে আরও শতাধিক মানুষ। শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে জেলায় তীব্র ভূমিকম্প অনুভূত হলে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভূকম্পের উৎপত্তি নরসিংদীর মাধবদীতে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল মাধবদী হওয়ায় নরসিংদীতে এর অনুভূত ও ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। ভূমিকম্পে নরসিংদীতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জেলার প্রায় সব উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা শহরসহ বিভিন্ন উপজেলার অনেক ভবন ফেটে ও হেলে পড়েছে। অন্যদিকে, ভয়াবহ ভূমিকম্পে পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাব-স্টেশনে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।
ভূমিকম্পে নিহতরা হলেন- সদর উপজেলার গাবতলি এলাকার মৃত আবদুল আজিজের ছেলে দেলোয়ার হোসেন (৩৭), তার শিশু সন্তান ওমর মিয়া (১২), পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর ইউনিয়নের মালিতা গ্রামের কাজেম আলী ভূইয়া (৭৫), ডাঙ্গা ইউনিয়নের ইসলামপাড়া নয়াপাড়া গ্রামের সিরু মিয়ার ছেলে নাসির উদ্দিন (৬০) ও শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের আজকিতলা গ্রামের মৃত শরাফাত আলীর ছেলে ফোরকান মিয়া (৪৫)।
স্থানীয় বাসিন্দা ওমর ফারুক জানায়, ভূমিকম্পের সময় আতংকিত হয়ে দেলোয়ার হোসেন তার সন্তানদের নিয়ে বাড়ির বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় ৬ তলা ভবনের দেয়াল ভেঙে তাদের ওপর পড়ে। পরে আশপাশের লোকজন তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে বাবা-ছেলের মৃত্যু হয়।
অপরদিকে ভূমিকম্পে পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর ইউনিয়নের মালিতা গ্রামে মাটির ঘর ভেঙে কাজম আলী নামে এক বৃদ্ধ গুরুতর আহত হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে স্বজনরা পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখান থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জেলা হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। আর ডাঙ্গা ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামে নাসির উদ্দিন ভূমিকম্পের সময় ফসলি জমি থেকে আতঙ্কিত হয়ে দৌঁড়ে আসার সময় রাস্তায় পড়ে মারা যায়। এদিকে শিবপুরের আজকিতলায় ভূমিকম্পের সময় গাছ থেকে পড়ে ফোরকান মিয়া আহত হয়। তাকে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিসা দিয়ে ঢাকায় নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
এদিকে, ভুমিকম্পে ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রেরর সাব-স্টেশনের একটি ট্রান্সফরমায় আগুন লেগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অপর ট্রান্সফরমারগুলোর অধিকাংশ সংযোগ ভেঙে পড়ে। খবর পেয়ে পলাশ ফায়ার এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
পলাশ ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আব্দুস সহিদ জানান, আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনে।
ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. এনামুল হক জানান, ভূমিকম্পে এ আগুনের ঘটনা ঘটে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
অফরদিকে, ঘেড়াশাল এলাকায় ঘোড়াশাল ডেইরি ফার্ম, ৬টি বাড়ি ও এস এ প্লাজা নামে একটি বহুতল শপিংমলে ফাটল ধরেছে। এছাড়া ঘোড়াশাল বাজার এলাকার বিভিন্ন ভবনের ছাদ থেকে দেয়ালের ইট পড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়।
ঘোড়াশাল বাজারের জুতার দোকানি আলম মিয়া বলেন, আমার দোকানে জুতাসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল ছিলো। ভূমিকম্প শুরু হলে সবকিছু দোকানের পড়ে আসবাবপত্র ভেঙে গেছে। মুদি দোকানদার আসলাম মিয়া বলেন, আমার দোকানের কাঁচের মালামাল পড়ে ভেঙে গেছে। আমি প্রথমে ভূমিকম্প বুঝতে পারি নি, মনে হয়েছে- কেউ হামলা করেছে। পরক্ষণেই বুঝতে পেরেছি, এটি হামলা নয়, ভূমিকম্প।
ঘোড়াশাল ঈদগাহ রোডের মারকাসুল সুন্নাহ তাহফিজুল কুরআন সুন্নাহ মাদ্রাসার পরিচালক মুফতি সালা উদ্দিন আনসারী বলেন, আমাদের ৬ তলা ভবনের ৪-৫ জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা ভয় পেয়ে আতঙ্কিত ছিল।
ভবনের মালিক আমানউল্লাহ বলেন, ভুমিকম্পে আমার ভবনে কয়েক জায়গায় ফাটল ধরেছে। ভবনের সব দোকানপাট বন্ধ করে দিয়েছে, কেউ ভয়ে দোকান খুলছে না।
নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. গুলশানা কবির বলেন, ভূমিকম্পে আহত হয়ে প্রায় অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ চিকিৎসা নিয়েছে। আর গুরুতর কয়েকজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
নরসিংদী পুলিশ সুপার মেনহাজুল আলম দুপুরে গাবতলি এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ সময় তিনি বলেন, ভূমিকম্পে জেলায় শতাধিক আহত হওয়ার খবর পেয়েছি। যেকোন দূযোগে জেলা পুলিশ সাধারণ মানুষের পাশে রয়েছে, তাদের নিরাপত্তায় সচেষ্ট রয়েছে পুলিশ।
নরসিংদী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন বলেন, ভূমিকম্পে জেলায় পাঁচজন নিহতের খবর পেয়েছি, সারাদিন আহতদের চিকিসার খোঁজখবর নিয়েছি। জেলা প্রশাসনের হটলাইন নাম্বার চালু করা হয়েছে, যেখানে আহত ও ক্ষয়ক্ষতির খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। আর নিহতদের সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান করা হবে, আহতদেরও চিকিসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।