রংপুর নগরী
মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৫৭ এএম
রংপুর নগরীর বুড়িরহাটের বেহাল সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে যানবাহন। প্রবা ফটো
রংপুর সিটি করপোরেশনের সড়ক সংস্কারসহ ১৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প ফাইলবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এতে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারছে না সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। ফলে দিন দিন নগরবাসীর দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান রংপুরকে উন্নয়নে দেশের এক নম্বর জেলা হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণার পরও উন্নয়ন প্রকল্প ফাইলবন্দি অবস্থায় থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতনরা।
রংপুর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, গণঅভ্যুত্থানের আগে রংপুর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ নগরীর উন্নয়নে রাস্তা বর্ধিতকরণ, সংস্কার ও মেরামত, রাস্তার পার্শ্ববর্তী ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শ্যামাসুন্দরী খালের ওপর দিয়ে চলাচলের ব্রিজ নির্মাণসহ সড়কসংশ্লিষ্ট নানা উন্নয়ন কাজের জন্য ২০২১ সালে স্থানীয় মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১ হাজার ৬৫৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার বারবার আশ্বাস দিয়েও সেই প্রকল্পটি বিভিন্ন অজুহাতে একনেকে অনুমোদন দেয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এই প্রকল্প অনুমোদনের আশায় বুক বেঁধেছিলেন নগরবাসী। চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম একনেক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে রংপুর সিটি করপোরেশনের ওই প্রকল্পটি পাস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা কমিশনের একটি চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘রংপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহ উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি আপাতত বাস্তবায়নের প্রয়োজন নেই। এরপর থেকে ওই প্রকল্পটি ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
এদিকে সড়ক সংস্কারের কাজ না হওয়ায় নগরীর প্রায় ৩০০ কিলোমিটার সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। জাহাজ কোম্পানি থেকে সাতমাথা সড়ক, সার্কিট হাউস সড়ক, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বুড়িরহাট সড়ক, মেডিকেল থেকে মডার্ন মোড় পর্যন্ত সড়কের অসংখ্য খানাখন্দ রয়েছে। ভাঙাচোরা সড়কে যাতায়াত করা নগরবাসীরা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে স্কুলগামী শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। যানবাহন চালকরাও পড়েছেন বিপাকে। এসব সড়কে প্রতিদিন চলাচলের কারণে রিকশা, অটোরিকশা, কার, মাইক্রো, ট্রাকসহ নানা যানবাহন বিকল হয়ে পড়ছে। গেল বর্ষায় খানাখন্দ ও পানি জমে থাকা সড়কে শতাধিক নারী-পুরুষ দূর্ঘটনান কবলে পড়েছে।
অন্যদিক চলতি শুষ্ক মৌসুমে ভাঙা সড়কের ধুলায় নাকাল নগরবাসী। ধুলার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা, শ্বাসকষ্ট, চোখের নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নগরবাসী।
এদিকে নগরীর সড়ক সংস্কারে নগরবাসী দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে জাহাজ কোম্পানি মোড় থেকে সাতমাথা মোড় পর্যন্ত সড়কটি চলাচলের একেবারেই অযোগ্য হয়ে পড়ায় স্থানীয়রা সিটি করপোরেশনের গায়েবানা জানাজা, সড়কে ধান রোপণ করেছেন। এর পরও অর্থ সংকটের কারণে সিটি করপোরেশন সড়কটি মেরামত করতে পারেনি।
সাতমাথা থেকে জাহাজ কোম্পানি সড়কে চলাচলকারী অটোচালক মাহফুজুল মিয়া বলেন, আমি মহাজনের অটোরিকশা চালাই। এই রাস্তাটা ভাঙাচোরা হওয়ায় যাত্রী পরিবহন করতে অনেক কষ্ট হয়। প্রায় সময় অটোরিকশার বিয়ারিংসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যায়।
যাত্রী আমিনুল ইসলাম বলেন, মুই বুড়া মানুষ, এই ভাঙা আস্তা দিয়া যাতায়াত করতে ম্যালা কষ্ট হয়। যদি সরকার আস্তাগুলা ভালো করিল হয়, তাইলে হামার অনেক উপকার হইল হয়। সিটির ম্যালা আস্তা ভাঙাচোরা হয়া গেইচে।
রংপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, আমি দায়িত্বে থাকাকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠিয়েছিলাম। সেটি একনেকে ওঠার পর তৎকালীন সেইসব প্রকল্প রিভাইস করে চাওয়া হয়েছিল। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী আবারও প্রস্তাবনা পাঠিয়েছিলাম। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও ওই প্রস্তাবনা পুনরায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সরকার সেটি এখন পর্যন্ত পাস করেনি বলে জেনেছি।
রংপুর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আজম আলী বলেন, সড়ক সংস্কারসহ ১৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সেটি পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে নগরীর সড়কসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। আশা করছি দ্রুতই প্রস্তাবনাটি একনেকে পাস হবে।
রংপুর জেলা সুজনের সহসাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহে আলম বলেন, পতিত সরকারের আমলে রংপুর জেলা অবহেলিত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান রংপুরে এসে বলেছিলেন রংপুর হবে এক নম্বর জেলা। অথচ সরকার ক্ষমতায় বসে এক বছর অতিবাহিত করলেও সিটি করপোরেশনের ১৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পের ফাইল এখনও আটকে রয়েছে। আমরা মনে করি, রংপুর আগে বৈষম্যের শিকার ছিল, এখনও রয়েছে। আমরা এই বৈষম্য থেকে মুক্তি চাই।