মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ১১:০১ এএম
সুন্দরবনের দক্ষিণ প্রান্তে, বঙ্গোপসাগরের নোনাজল ঘেঁষে বিস্তৃত দুবলার চরের আলোরকোল নিউমার্কেট। প্রবা ফটো
নিউমার্কেট বলতে আমরা যেটা বুঝি শানশওকতে ভরা ইটপাথরে গড়া সুরম্য ভবন। যেখানে আছে শহুরে মানুষদের বিলাসিতার পণ্যে সাজানো চোখ ধাঁধানো সারি সারি দোকান। কিন্তু এ নিউমার্কেট ভিন্ন রকমের। একেবারেই আলাদা। সুন্দরবনের দক্ষিণ প্রান্তে, বঙ্গোপসাগরের নোনাজল ঘেঁষে বিস্তৃত দুবলার চরের আলোরকোল। জেলেদের মাছ ধরা ও শুকনো মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য বিখ্যাত এই চর এখন শুধু শ্রমের কেন্দ্র নয়। বরং একটি ছোট্ট জনজীবনের প্রতিচ্ছবি বহন করছে। এর নাম নিউমার্কেট। মৌসুমি এই বাজারটি জেলেদের জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে।
এই বাজারে নেই দোতলা ভবন বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত
দোকান। বাঁশ, টিন ও প্লাস্টিকের ছাউনি দিয়ে গড়া ছোট ছোট দোকানই গড়ে তুলেছে এই জীবন্ত
জনপদ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জেলেদের আনাগোনা আর বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখর থাকে
পুরো এলাকা।
আলোরকোলের নিউমার্কেটে পাওয়া যায় প্রায় সবকিছু চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি, শুকনো মাছ তৈরির উপকরণ, জাল মেরামতের সুতা, কাপড়চোপড় এমনকি
মোবাইল সার্ভিসিং, ফার্মেসি আর নরসুন্দর সেলুন পর্যন্ত। এখানে খাবারের দোকান থেকে শুরু
করে মেলে কম্পিউটার সার্ভিস, মেকানিক্যাল যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রিক অ্যাকসেসরিজ, জামাকাপড়
এমনকি শিশুদের খেলনাও।
কাঁচামালের দোকানি দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমরা
বছরে পাঁচ মাস এখানে থাকি। এই সময়টায়ই পুরো বছরের রোজগার করতে হয়। জেলেদের প্রায় সব
চাহিদাই এখান থেকেই মেটানো যায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা ক্রেতা আসে।
রুবেল গাজী, যিনি নৌকার ইঞ্জিন মেরামতের দোকান
চালান। তিনি বলেন, জেলেদের নৌকা সব সময় সমুদ্রে চলে। মাঝেমধ্যে ইঞ্জিন নষ্ট হলে আমরা
এখানে মেরামত করি। আমাদের এই দোকান না থাকলে তাদের অনেক ক্ষতি হতো। অন্যদিকে আরশাদ,
যিনি এখানে মৌসুমি কাপড়ের দোকান চালান। তিনি জানান, শীতের সময় জেলেরা লুঙ্গি, সোয়েটার,
কম্বল এসব কিনে নেন। আমরা বরগুনা থেকে মাল এনে বিক্রি করি। পাঁচ মাসে ভালো বিক্রি হয়,
তার পর সবাই বাড়ি ফিরে যাই।
সমুদ্র থেকে মাছ ধরে ফেরা জেলেরা বিকালবেলা
এই বাজারেই বিশ্রাম নেন। কেউ চা দোকানে গল্পে মাতেন, কেউ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনেন।
সন্ধ্যা নামলে জেনারেটর ও সোলারের সাহায্যে জ্বালানো আলোয় ঝলমল করে ওঠে পুরো বাজার।
চায়ের দোকানি আবদুল কুদ্দুস বলেন, দিনভর জেলেরা
সমুদ্রে থাকে। সন্ধ্যায় চা খেতে এসে গল্প করেন, হাসেন। এই চা দোকানটাই তাদের আড্ডাখানা।
বন বিভাগের তথ্যানুসারে, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি
পর্যন্ত এই বাজারে অর্ধ লক্ষাধিক জেলে ও শ্রমিক অস্থায়ীভাবে বসবাস করেন। মৌসুমি দোকানগুলো
থেকেই প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়।
রাসপূজার সময় নিউমার্কেটে নেমে আসে উৎসবের
আমেজ। রঙিন আলো, চুলার ধোঁয়া আর বাতাসে মিশে থাকা শুঁটকির গন্ধে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে
এক জীবন্ত চিত্রপট। এ সময় পর্যটকরাও ভিড় জমান এই অনন্য বাজারে।
পর্যটক কলেজ শিক্ষক আজহারউদ্দীন। তিনি খুলনা
শহর থেকে ঘুরতে এসেছেন। তিনি বলেন, ভেবেছিলাম একটা সাধারণ মাছের বাজার দেখব। কিন্তু
এখানে তো ছোট্ট একটা শহরই গড়ে উঠেছে! সবকিছুই আছে কিন্তু পরিবেশটা একেবারে অন্যরকম।
তবে পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন, অতি ভিড় ও বর্জ্য
ব্যবস্থাপনার অভাবে দুবলার চরের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়তে পারে। পরিবেশকর্মী অ্যাডভোকেট
বাবুল হাওলাদার বলেন, এ চরের জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত নাজুক। ব্যবসা ও পর্যটনের সুযোগ
থাকলেও পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা অপরিহার্য। স্থানীয়ভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা
গড়ে তোলা দরকার।
সব মিলিয়ে আলোরকোলের নিউমার্কেট শুধু একটি
মৌসুমি হাট নয়। এটি সুন্দরবনের প্রান্তিক জীবনের প্রতিচ্ছবি। জেলেদের ঘাম, পরিশ্রম,
আশা আর সমুদ্রের নোনা বাতাসে ভেসে থাকা জীবনের গল্পে প্রতি বছর নবজন্ম নেয় এই বাজার,
যেখানে শহরের কোলাহল নেই, আছে বেঁচে থাকার এক অবিচল ছন্দ।