নওগাঁ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:২২ পিএম
নওগাঁর ধামইরহাটের দলিত সম্প্রদায়ের যুবক নিতাই রবিদাস (৩০) হত্যাকাণ্ডের এক মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত এর রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি। এমনকি জড়িত সন্দেহে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার ও দলিত সম্প্রদায়ের লোকজন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।
শনিবার (৮ নভেম্বর) দুপুরে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও নিরাপত্তার দাবিতে নওগাঁ শহরের মুক্তির মোড় শহীদ মিনারের সামনে দলিত সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়েছে।
মানববন্ধন ও সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল মুক্তির মোড় থেকে শুরু করে ডিসি-এসপি বাসভবন হয়ে নওগাঁ শহরের প্রধান-প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে নেতারা মিছিল সহকারে মুক্তির মোড় শহীদ মিনারে এসে ‘আগামী ৭ দিনের মধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার না করা হলে ধামইরহাট উপজেলা ও থানা ঘেরাওসহ লাগাতার আন্দোলনের ঘোষণা দেন। পরে অনুরূপ সমাবেশ মহাদেবপুর বাসস্ট্যান্ডে (মাছ চত্বর) অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শতাধিক আদিবাসী ও রবিদাস জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন পর্যায়ের জনগণ অংশ নেন এবং নেতারা বক্তব্য রাখেন।
মানববন্ধন ও সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ‘বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম)’- কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিপন কুমার রবিদাস।
নওগাঁ জেলা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট-এর সভাপতি মিজানুর রহমানের সঞ্চালনায় ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত মানববন্ধন ও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কৃষক সমিতিÑ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড মহসিন রেজা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-নওগাঁ জেলা শাখারসহ সাধারণ সম্পাদক আলিমুর রেজা রানা, বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম)- কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বাবুল রবিদাস, জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি এস এম আজাদ হোসেন মুরাদ, জেলা বাসদের সদস্য রবিউল টুডু, জাতীয় আদিবাসী পরিষদÑ কেন্দ্রীয় কমিটি (বিচিত্রা-নরেন)-এর সাংগঠনিক সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র হেমব্রম, জাতীয় আদিবাসী পরিষদÑ কেন্দ্রীয় কমিটি (গণেশ-বিমল) এর কোষাধ্যক্ষ সুধীর তির্কী, মহাদেবপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নয়ন পাহান, আদিবাসী নারী পরিষদ- নওগাঁ জেলা শাখার সভাপতি নিতু মুন্ডা, বাংলাদেশ রবিদাস ফোরাম (বিআরএফ) নওগাঁ জেলা শাখার সভাপতি মোহন রবিদাস, বিডিইআরএম- নওগাঁ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিরেন রবিদাস, হত্যাকাণ্ডের শিকার নিতাই রবিদাসের মা জামিনী রানী রবিদাস, কাকাতো ভাই বাবুলাল রবিদাস ও কাকাতো বোন অনিমা রানী রবিদাস।
‘বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম)’- কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিপন কুমার রবিদাস বলেন, ‘নওগাঁর ধামইরহাটে নিতাই রবিদাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ১ মাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল। কিন্তু অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশ-প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়টি আমাদের হতাশ করেছে। শুক্রবার আমরা একটি প্রতিনিধিদল সরেজমিন পরিদর্শন ও ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি। আমরা বিষয়টির আশু সমাধান ও সুবিচারের আশায় এ মানববন্ধন ও সমাবেশে উপস্থিত হয়েছি। যদি পুলিশ-প্রশাসন অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে গড়িমসি করে তবে আমরা ঢাকাসহ সারাদেশে লাগাতার আন্দোলন সংগঠিত করব। দেশের প্রান্তিক মানুষের ন্যায়বিচারের বিষয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের এমন নীরবতা শুভ লক্ষণ নয়।’
বক্তারা বলেন, সেননগর গ্রামের বিনয় রবিদাসের ছেলে নিতাই রবিদাস (সোমবার) ০৬ অক্টোবর দুপুরে ধামইরহাটে কাজ আছে বলে বাড়ি থেকে বের হয়। ঐদিন তাদের পাড়ায় কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার আয়োজন ছিল। রাত পর্যন্ত বাড়িতে না ফিরলে পরিবারের লোকজন তার ব্যবহৃত মুঠোফোন বন্ধ থাকায় কোনো খবর না পেয়ে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর নেন। পরের দিন জানতে পারেনÑ ফতেপুর-চকগৌরী সড়কের ফতেপুরে সাবেক ব্র্যাক ব্যাংকের পূর্ব দিকে পাকা রাস্তার পাশে ড্রেনে একটি লাশ পড়ে আছে। পরিবারের লোকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে নিতাই রবিদাসের মরদেহটি শনাক্ত করে। মরদেহটির মাথায় মারাত্মক জখমের চিহ্ন ছিল। ধারণা করা হচ্ছে দুর্বৃত্তরা তাকে মাথায় আঘাত করে হত্যা করেছে। নিহত নিতাই রবিদাসের বাবা বিনয় রবিদাস বাদী হয়ে ধামইরহাট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। নিহত নিতাই রবিদাস ওয়ার্ল্ড ভিশন ধামইরহাট এপি কার্যালয়ে ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে কাজ করত।
নিহত নিতাই রবিদাসের মা জামিনি রানী (৫২) বলেন, ‘নিতাইয়ের সঙ্গে এলাকার কারো বিরোধ বা মনোমালিন্য ছিল না। আমরা রবিদাস সম্প্রদায়ের ২৩টি পরিবার সেননগরে বাস করি। নিজেদের পরিশ্রম ও প্রচেষ্টায় উন্নতির পথে এগুচ্ছি। বিধায় এলাকায় একটি মহল ঈর্ষান্বিত হয়ে এমনটা করে থাকতে পারে। কারা করেছে, সেটা বের করার দায়িত্ব পুলিশের। পুলিশ চাইলেই সেটা করতে পারেন। কিন্তু আমরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অসহায় মানুষ বিধায় আমাদের গুরুত্বহীন করে দেখা হচ্ছে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’
নিতাইয়ের কাকা দীলিপ রবিদাস (৫৫) জানান, ‘ঘটনার পরদিন আমরা ব্যানার, মাইকসহকারে সকল ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে ধামইরহাট থানা এলাকায় মানববন্ধন ও শোক র্যালি আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু থানা পুলিশের পক্ষ থেকে তা করতে নিষেধ করা হয়। কর্মসূচি হাতে নিলে আসামিরা অন্যত্র পালিয়ে যেতে পারে বলে আপাতত এসব বন্ধ রাখতে বলা হয়। তারা খুব তাড়াতাড়ি আসামি ধরবেন এবং সুবিচারের নিশ্চয়তা দেন। অথচ আজ নিতাই হত্যাকাণ্ডের ১ মাস ১ দিন। কিন্তু ধামইরহাট থানা পুলিশের আশ্বাসে আমাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশার গুড়েবালিতে পরিণত হয়েছে। পুলিশের ভূমিকা অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা এতে হতাশ। দেওয়ালে আমাদের পিঠ ঠেকে গেছে। রাষ্ট্র যদি আমাদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গড়িমসি করে, তবে আমরা কোথায় যাব?’
সমাবেশে বক্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সমাজের অত্যন্ত পিছিয়েপড়া রবিদাস জনগোষ্ঠীর ওপর এমন আঘাত সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, ফেলবে। আমরা মনে করি, এ বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। রবিদাস তথা অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সদস্যরা এ দেশেরই নাগরিক, তাদের জীবন-জীবিকা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি তাদের মৌলিক মানবাধিকার। তাদের জীবন, অস্তিত্ব এবং সম্মান রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। আমরা মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং সংবাদমাধ্যমের সহায়তা কামনা করছি। যাতে এই মানুষের কণ্ঠ রোধ না হয় এবং তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। আমরা সরকারের কাছে সংবেদনশীল, মানবিক ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রত্যাশা করছি।