ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ, মহেশখালী (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:৩০ পিএম
বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত মহেশখালীর পান ভাস্কর্য যাত্রীসেবায় ফয়সাল’স ডাইন। সম্প্রতি তোলা
কক্সবাজারের মহেশখালীতে যাত্রীসেবার উদ্দেশ্যে নির্মিত ২ কোটি টাকার পান ভাস্কর্য ভবন বিলাসী রেস্টুরেন্টে পরিণত হয়েছে। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বসার স্থান, নামাজের জায়গা, গণশৌচাগার ও শোরুমের ব্যবস্থা রাখার কথা থাকলেও বর্তমানে ভবনটির ওপর থেকে নিচতলা পর্যন্ত ব্যবহৃত হচ্ছে রেস্টুরেন্ট হিসেবে। যাত্রীসেবার নামে এই অবকাঠামো এখন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। ভবনটি পরিচালনা করছেন মহেশখালীর ফয়সাল আমিন নামে এক তরুণ।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) উদ্যোগে মহেশখালীর ঘোরকঘাটা জেটিঘাট এলাকায় যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে নির্মিত এই ভবনটি এখন যাত্রীসেবা থেকে বঞ্চিত দ্বীপবাসীর হতাশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। কউক দাবি করেছিল, নৌপথে আগত পর্যটক ও স্থানীয়দের জন্য এখানে থাকবে বিশ্রামাগার, নারীদের ব্রেস্টফিডিং রুম, পাবলিক টয়লেট ও ফুড কর্নার। কিন্তু এখন ভবনটির পুরো অংশ ও সব সুবিধা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যাত্রীসেবা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
চুক্তি অনুযায়ী ভবনের নির্দিষ্ট অংশ ভাড়া নেওয়ার কথা থাকলেও মোহাম্মদ ফয়সাল আমিন পুরো ভবন দখলে নিয়ে চালাচ্ছেন রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। কউকের নির্ধারিত অংশ ছাড়িয়ে নারীদের ব্রেস্টফিডিং রুম, গণশৌচাগার ও পাবলিক ওয়াশরুম পর্যন্ত দখল করে নিয়েছেন তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব সুবিধা বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় যাত্রীদের মৌলিক সেবাও নিশ্চিত হচ্ছে না। এতে সরকারি সম্পদ ব্যবহারে চরম অনিয়ম হচ্ছে আর উদাসীন ভূমিকা পালন করছে প্রশাসন।
মহেশখালীতে বেড়াতে আসা ভ্রমণপিপাসু মুহাম্মদ মেহরাজ বলেন, তিন বছর আগে যেমন দুর্ভোগ দেখেছি, আজও তেমনই আছে। যাত্রীসেবার নামে ভবন করে কউক পুরোদস্তুর বাণিজ্য শুরু করেছে। উন্নয়নের গল্প শুনিয়ে কউক বাণিজ্যিকভাবে ভবনটি ভাড়া দিয়েছে, জনগণ কোনো সেবা পাচ্ছে না। তিনি মনে করেন, কউক ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকল্পের উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থে সরকারি সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২৫ মে মাসে ভবনের ৯৩৩ বর্গফুটের একটি ভোজনালয়, ৪৮৪ বর্গফুটের পাবলিক টয়লেট অংশ, তিনটি দোকান কামরা এবং ছাদের ৫৫০ বর্গফুট বর্ধিতাংশ মাসিক চুক্তিতে ফয়সাল’স ডাইন নামের রেস্টুরেন্টের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, চুক্তির বাইরে পুরো ভবনটি দখলে নিয়েছেন ফয়সাল আমিন। এমনকি কউকের কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশে এই দখল কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পর্যটক সাদিয়া জাহান বলেন, এখানে নারীদের ব্রেস্টফিডিং রুম থাকার কথা শুনেছিলাম, কিন্তু সবকিছু এখন রেস্টুরেন্টে পরিণত। সরকারি তত্ত্বাবধানে থাকলে আমরা অন্তত নিশ্চিন্তে ব্যবহার করতে পারতাম। এখন শৌচাগারেও প্রবেশে সংকোচ হয়। ভবনটিতে অতিরিক্ত লোকসমাগম হওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকিও দেখা দিয়েছে। নারী পর্যটকদের এমন অভিজ্ঞতা প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
শুধু তা-ই নয়, ভবনটির সামনের অংশে স্থাপন করা মহেশখালীর ইতিহাস সংবলিত পান ভাস্কর্যের ওপরে ফয়সাল’স ডাইনের বিজ্ঞাপন দেওয়ায় ভোজনালয় ব্যবসার শুরুতেই সমালোচনার তোপে পড়েছিল ফয়সাল আমিন। অনেক নেটিজেন সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে পান ভাস্কর্যের ওপরে বিজ্ঞাপন দেওয়ার কড়া সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ লিখেছেনÑ পান ভার্স্কয যেন ফয়সাল ডাইনের লোগো। এটি যে মহেশখালীর ইতিহাস তার কোনো চিহ্নই নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কউক কর্মকর্তাদের গোপন সম্মতিতে ফয়সাল আমিন সরকারি ভবনটি ব্যবহার করছেন ব্যক্তিগত আয়বর্ধনের কাজে। যাত্রীসেবার নামে কোটি টাকার এই প্রকল্প এখন বাণিজ্যিক মুনাফার স্থাপনা। পর্যটনবান্ধব অবকাঠামোর উদ্দেশ্য পূরণ না হয়ে এটি পরিণত হয়েছে প্রশাসনিক উদাসীনতা ও দুর্নীতির উদাহরণে। দ্বীপবাসীর দাবি, সরকারি সম্পদ ফের জনগণের সেবায় ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে তদন্ত ও পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এস্টেট ও ভূমি) উপপরিচালক মাহমুদুল হাসান তথ্য দিতে নানা গড়িমসি শুরু করেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, যাত্রীসেবা নিশ্চিতের কথা ফয়সাল আমিনকে বলে দেওয়া আছে। এ ছাড়াও পুরো ভবন বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়ার সরকারি নিয়ম আছে বলেও জানান তিনি। যাত্রীসেবার নামে করা ভবনটি বাণিজ্য ভবনে রূপ নেওয়ার কারণে যাত্রীসেবা নিশ্চিত না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সদুত্তর দিতে পারেননি কউকের এ কর্মকর্তার। পুরো ভবন বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়ার সরকারি নিয়মের কোনো নথিও তিনি দেখাতে পারেননি।