খুলনা অফিস ও কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৫ ২০:৫৯ পিএম
সুন্দরবনের দুবলার চরের আলোরকোলে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তিন দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব। বুধবার (৫ নভেম্বর) ভোরে পূর্ণিমার ভরা জোয়ারে সৈকতের লবণাক্ত জলে পুণ্যস্নানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। ভোর সাড়ে ৫টা থেকে শুরু হয়ে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী চলে পুণ্যস্নান।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে হাজারো নারী, পুরুষ ও শিশু ভক্ত সমুদ্রতটে নেমে স্নান, ধূপধুনো প্রজ্বালন ও পূজা-আর্চনা সম্পন্ন করেন। স্নান শেষে তারা রাধা-কৃষ্ণের মন্দিরে অর্ঘ্য নিবেদন করেন এবং নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা দেন।
এর আগে গত সোমবার রাতে আলোরকোলে স্থাপিত অস্থায়ী মন্দিরে রাস পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এদিন ভোর থেকে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই ও ঢাংমারী স্টেশন থেকে পাস নিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ট্রলার ও লঞ্চে চেপে আসেন দুবলার চরে।
এদিকে রাতভর আরাধনা শেষে বুধবার ভোরে হাজার হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী নর-নারীর সাগরে পুণ্যস্নানের মধ্য দিয়ে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় শেষ হয়েছে রাস উৎসব। এর আগে মোমবাতি, আগরবাতি, ফুল, দুর্বা, হরতকি, ডাব, কলা, তেল ও সিঁদুর সমুদ্রের জলে অর্পণ করেন সনাতনী নারীরা। এ সময় লক্ষাধিক নারী পুরুষের উপস্থিতি এবং উলুধ্বনি ও মন্ত্রপাঠে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো সৈকত এলাকা। অনেকে প্রায়ঃশ্চিত ও পিন্ডদানের পাশাপাশি মাথা ন্যাড়া করেন। পরে সৈকত সংলগ্ন শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ তীর্থযাত্রি সেবাশ্রমে ১৭ জোড়া যুগল প্রতিমা দর্শন করেন ভক্তরা। উল্লেখ্য রাসপূজা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও এ উৎসব উপলক্ষ্যে কলাপাড়ার মদনমোহন সেবাশ্রম মন্দিরে ৫ দিনব্যাপী চলবে রাসমেলা।
প্রসঙ্গত প্রতি বছর কার্তিক পূর্ণিমা তিথিতে সুন্দরবনের দক্ষিণ প্রান্তের আলোরকোল দ্বীপে আয়োজিত হয় রাস পূজা। এ বছরও সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল ও পটুয়াখালীসহ উপকূলীয় অঞ্চলগুলো থেকে হাজারো ভক্তের আগমন ঘটে। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এবারের উৎসবে আলোরকোলে ১৩ হাজার ৫০০ এরও বেশি পুণ্যার্থী অংশগ্রহণ করেন। তবে স্থানীয় সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, উপস্থিতির সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার।
দুবলা চরের মন্দির সংলগ্ন খোলা মাঠে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। প্রথম দিন সন্ধ্যায় শুরু হয় আরাধনা ও প্রদীপ প্রজ্বলন, দ্বিতীয় দিন চলে হরিনামসংকীর্তন, ধর্মীয় সংগীত ও নানা আচার। তৃতীয় দিন সকালে পুণ্যস্নানের মধ্য দিয়ে পূজা শেষ হয়।
পুন্যার্থী বিপ্লব মণ্ডল বলেন, ‘আমরা আশাশুনি থেকে প্রতিবছর এখানে আসি। শেষ ধাপে ধূপধুনো, ডাব ও বেলপাতা দিয়ে পূজা শেষ করি, তারপর সাগরের জলে স্নান করে আত্মার পরিশুদ্ধি লাভ করি।’
রাস উৎসব চলাকালীন বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের একাধিক টিম সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘উৎসবটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।’ রাস উৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি ও দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, ‘৩ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া তিনদিনের রাস উৎসব কোনো রকম বাধাছাড়াই শেষ হয়েছে।’
বাংলাদেশ কোস্টগার্ড ওয়েস্ট জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মেহেদী হাসান বলেন, ‘বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা নিরাপত্তা দিয়েছি।’
প্রসঙ্গত দ্বাপর যুগে কংশ রাজাকে বশ করে পূর্নিমা তিথিতে বৃন্দাবনে হয় রাধা কৃষ্ণের পরম প্রেম। সেই থেকেই মূলত রাস উৎসবের প্রচলন। তারই আদলে ১৮শ শতকের শেষভাগে বা ১৯শ শতকের শুরুর দিকে হিন্দু সন্ন্যাসী হরভজন দাস দুবলা চরে রাস পূজার সূচনা করেন। এরপর থেকে এটি শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় জীবনের সঙ্গে আধ্যাত্মিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়ে আসছে।