কক্সবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৩ এএম
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবু রায়হানের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। অভিযোগ রয়েছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজার উন্নয়ন সার্কেলের এই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবু রায়হান নিয়মিত অফিস করেন না। সপ্তাহের বেশিরভাগ সময় থাকেন কর্মস্থলের বাইরে। তিনি গোপন দরপত্র করে পছন্দের ঠিকাদার ও আত্মীয়-স্বজনকে কাজ পাইয়ে দেন। শুধু তা-ই নয়, তার বিরুদ্ধে কাজের সময় বৃদ্ধিতে হয়রানি, অর্থ আদায়, ঘুষের জন্য স্থানীয় ঠিকাদারদের বিল আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে।
এর মধ্যে মন্ত্রণালয়ের
আদেশও মানছেন বলে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি কক্সবাজার সৈকতের ভাঙনরোধ ও
ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে জরুরি ভিত্তিতে জিওটিউব স্থাপন ও সৈকতের ঝাউগাছসহ পর্যটন করপোরেশনের
জমি রক্ষার্থে বিচের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করার জন্য পর্যটন
মন্ত্রণালয় ও পানিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশনা দিয়েছে।
কিন্তু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাকে তোয়াক্কা না করে উল্টো কাজ বন্ধ করে রেখেছেন তত্ত্বাবধায়ক
প্রকৌশলী মো. আবু রায়হান। জরুরি ভিত্তিতে সৈকতের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে কাজ কেন করা হচ্ছে
না তার জন্য ওই তত্ত্বাবধায়ককে শোকজ নোটিসও দিয়েছে পানিসম্পদ অধিদপ্তর।
গত ২৭ জুলাই বাংলাদেশ
পর্যটন করপোরেশনের কক্সবাজারস্থ মোটেল শৈবালের ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমদ কক্সবাজার
জেলা প্রসাশক বরাবর একটি স্মারকপত্র প্রেরণ করেন। যেখানে উল্লেখ করা হয় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের
কবিতা চত্বর থেকে লাবণী বিচ পর্যন্ত হোটেল শৈবালের জমি সমুদ্রের ঢেউয়ের স্রোতে বিলীন
হয়ে যাচ্ছে। এই ভাঙন রোধে সৈকতের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে জরুরি ভিত্তিতে জিওটিউব পুনঃস্থাপনের
জন্য অনুরোধ করা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে
গত ২৮ জুলাই কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইমরান হোসেন
সজিব স্বাক্ষরিত একটি স্মারকপত্র কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী
বরাবর প্রেরণ করা হয়। এতে বলা হয় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কবিতা চত্বর থেকে লাবণী বিচ
পয়েন্ট পর্যন্ত সৈকতের ভাঙনরোধ ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে জিওটিউব পুনঃস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয়
ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়। এরপরও কোনো প্রদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
যার পরিপ্রেক্ষিতে
গত ২৬ আগস্ট বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পর্যটন শাখা-১-এর উপসচিব
মো. সাইফুল ইসলাম মন্ডল স্বাক্ষরিত আরও একটি স্মারকপত্র প্রদান করেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়
বরাবর। এতেও জরুরি ভিত্তিতে সৈকতের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে জিওটিউব স্থাপনসহ ভাঙনরোধ ও
শহর রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়। বেসামরিক
বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রেরিত স্মারকপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ সেপ্টেম্বর
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ শাখার উপসচিব যতিন মার্মা স্বাক্ষরিত স্মারকে জরুরি
ভিত্তিতে কক্সবাজারের হোটেল শৈবালের জমি বরাবর কবিতা চত্বর থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত
ভাঙনরোধে সৈকতের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে জিওটিউব স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয় কক্সবাজার
পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। কিন্তু এরপর কেটে গেছে দেড় মাসের বেশি। তবুও জরুরি কাজটি করার
কোনো উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক
প্রকৌশলী মো. আবু রায়হান।
প্রাপ্ত তথ্যমতে,
২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পদোন্নতি পেয়ে ঝিনাইদহ থেকে পাউবো কক্সবাজার সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক
প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. আবু রায়হান। এর মাস দুয়েক পরই তার ভাগ্নে মোহাম্মদ
তুহিন, বন্ধু আলমগীর হোসাইন ও টিটু নামের তিনজনকে কক্সবাজার নিয়ে আসেন তিনি। যারা এখন
কক্সবাজারে পাউবোর নানা কাজ করছেন।
এ বিষয়ে কক্সবাজারের
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সি ফাইন ইন্টারন্যাশনাল’-এর স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান বলেন,
আবু রায়হান ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা না মেনে স্বেচ্ছাচারী মনোভাব নিয়ে অফিস
চালান। টাকা ছাড়া তার দপ্তর কোনো ফাইল নড়ে না। এই তত্ত্বাবধায়ক কক্সবাজারে যোগদানের
পর থেকেই স্থানীয় ঠিকদারদের বিল আটকে দেওয়াসহ কাজের সময় বাড়াতে গেলেই টাকার জন্য হয়রানি
করেই যাচ্ছেন। এছাড়া তিনি তার ভাগ্নে, বন্ধুসহ পছন্দের কিছু ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে
দরপত্র ফাঁস করছেন।
সম্প্রতি টানা ১৫
দিন পাউবোর কক্সবাজার কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, তত্ত্বাবধায়কের কক্ষ তালাবদ্ধ। এ সময়
তিনি কোথায় জানতে চাইলে তার অধীনস্তরা সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। কেউ বলেছেন তিনি ঢাকায়
কেউ বলেছেন গ্রামের বাড়িতে রয়েছেন।
জানা গেছে, ৯ অক্টোবর
থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি কক্সবাজারে ছিলেন না। ১৮ অক্টোবর শনিবার কক্সবাজার আসেন।
একই দিন কক্সবাজারে তিন দিনের সফরে আসেন পাউবোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পূর্ব রিজিয়ন)
মাহাবুবুর রহমান। এরপর আবার আবু রায়হান ২৩ অক্টোবর কক্সবাজার ত্যাগ করেন। ২ নভেম্বর
পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজার গিয়ে দেখা যায়, তত্ত্বাবধায়ক আবু রায়হান এখনও তার কর্মস্থলে
আসেননি। তার অফিসে তালা ঝোলানো।
এ বিষয়ে পাউবোর
কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম পান্না বলেন, ২৭ ও ২৯ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক
ঢাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বৈঠকে ছিলেন। এর আগের বিষয়ে জানা নেই।
কক্সবাজারের স্থানীয়
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লাবিব এন্টারপ্রাইজেরের মালিক দিদারুল আলম বলেন, আবু রায়হান যোগদানের
পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়মকানুন উলোটপালট হয়ে গেছে। স্থানীয় ঠিকাদারদের হয়রানি করা,
মন্ত্রণালয়ের আদেশ থাকার পরও জরুরি কাজ না করা, সঠিক সময়ে বিল না দেওয়া এখন ওখানকার
নৈমত্তিক ঘটনা। এসব জানার পর আমি আপাতত পানি উন্নয়ন বোর্ডের দরপত্র জমাদান থেকেই দূরে
থাকছি।
অভিযুক্ত পাউবো
কক্সবাজার প্রকৌশলী মো. আবু রায়হান ঘুষ, কাছের মানুষ-জনদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগগুলো
হাস্যকর দাবি করে বলেন, মূলত কক্সবাজারের ঠিকদাররা টেন্ডারই ড্রপ করেন না। গত জুলাইয়ে
১০টি কাজের বিপরীতে ৬২টি ট্রেন্ডার ড্রপ হয়েছে, যেখানে ৩-৪টি কক্সবাজারের লোকজনের।
এছাড়া যারা কাজ পান, তারাও সঠিক সময়ে তা বুঝিয়ে দিতে পারেন না।
জরুরি কাজ কেন করা
হচ্ছে নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মহাপরিচালকের মৌখিক নির্দেশেই জরুরি কাজটি
বন্ধ রাখা হয়েছে। এই কাজটি বন্ধ রাখার কারণ জানতে চেয়ে আমাকে মন্ত্রণালয় চিঠি পাঠিয়েছে।
আমি তাদের জবাব পাঠাব। যদিওবা গত ১৮ বছরের চাকরিজীবনে এমন চিঠি এর আগে পাইনি।
কক্সবাজারে নিয়মিত
অফিস না করার বিষয়ে আবু রায়হান বলেন, ফাইল-চিঠিপত্র চালাচালি করে এদেশে কাজ আদায় করা
সম্ভব না। এজন্যই কাজের প্রয়োজনেই ও বিভিন্ন বৈঠকে অংশগ্রহণ করতেই আমাকে বেশিরভাগ সময়
ঢাকায় অবস্থান করতে হয়।
এ বিষয়ে কথা বলার
জন্য গত দুদিন পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. এনায়েত উল্লাহর মোবাইলে কল করা হলেও
তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি খুদেবার্তা পাঠানোর পরও জবাব মেলেনি।
এদিকে কক্সবাজার
পানি উন্নয়ন বোর্ডে যোগদানের আগে তিনি ঝিনাইদহ ও রাজশাহী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীর
দায়িত্ব পালন করার সময়ও একই অভিযোগে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন সেখানকার স্থানীয় জনতা।
এমনকি ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন টেন্ডার জালিয়াতির
অভিযোগে নিজ দপ্তরে তিনি ঠিকাদারদের দ্বারা হামলার শিকার হন।