শুকনো মৌসুমে পায়ে হেঁটে পার হওয়া গেলেও বর্ষায় রুদ্রমূর্তি ধারণ করে সোমেশ্বরী নদী। ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে ফুলে-ফেঁপে ওঠা এ নদীতে কোনো সেতু না থাকায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা ইউনিয়ন ও নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার লাখো মানুষ।
শুষ্ক মৌসুমে নদী পারাপারে মাত্র ৩০ ফুট বাঁশের চাটাই ব্যবহার করেন স্থানীয়রা। কিন্তু বর্ষায় ঢলের পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে দুইপাড়ের দূরত্ব বেড়ে নদীটি প্রায় ৩০০ মিটার প্রশস্ত হয়। তখন ভরসা থাকে নৌকা। তবে তীব্র স্রোতের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে সব সময়। রাতে নৌকা চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েন যাত্রী ও রোগীরা।
নদীর পূর্বপাড়ে মধ্যনগরের বংশীকুণ্ডা ইউনিয়ন এবং পশ্চিমপাড়ে নেত্রকোনার বিশরপাশা বাজার, কলমাকান্দার বৃহত্তম বাণিজ্যিক কেন্দ্র। দুই পাড়ের মানুষকে প্রতিদিনই নিত্যদিনের কেনাকাটা, শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য নদী পারাপার হতে হয়।
বিশরপাশায় অবস্থিত হরিশ্চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় ও এভারগ্রিন কিন্ডারগার্টেনে পড়াশোনা করে বংশীকুণ্ডা ইউনিয়নের শিক্ষার্থীরা। বর্ষায় এসব কোমলমতি শিক্ষার্থীকে ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় নদী পার হতে হয়। এছাড়া বংশীকুণ্ডা ইউনিয়নে কোনো হাসপাতাল না থাকায় চিকিৎসার জন্য রোগীদের কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয় নদী পেরিয়ে। সন্ধ্যার পর নৌকা না থাকায় মুমূর্ষু রোগী নিয়ে পড়তে হয় মারাত্মক বিপাকে।
স্থানীয়রা জানান, সোমেশ্বরীর এক পাড়ে সুনামগঞ্জ, অন্যপাড়ে নেত্রকোনা জেলা। দুই জেলার সীমানায় হওয়ায় এ এলাকাকে গুরুত্ব দেন না জনপ্রতিনিধিরা। এমনকি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরেও (এলজিইডি) কোনো মাথাব্যথা নেই মানুষের ভোগান্তি নিয়ে। জনপ্রতিনিধিদের ঠেলাঠেলি আর প্রশাসনের গাফিলতির জন্য সেতু নির্মাণ হচ্ছে না বলে ধারণা স্থানীয়দের।
সোমেশ্বরীর উভয়পাড়ের লোকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এই নদী পার হয়েই মধ্যনগর ও কলমাকান্দা যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু নদীতে সেতু না থাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। বর্ষা মৌসুমে প্রায় ছয় থেকে সাত মাস নদীতে পানি বেশি থাকে। এ সময় শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাওয়ার সময় পড়তে হয় বিপাকে। অনেক সময় ঢলের পানির কারণে তীব্র স্রোতে যোগাযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।
বিশরপাশা এভারগ্রীন মডেল স্কুলের অধ্যক্ষ বিপ্লব কুমার সাহা বলেন, ‘সব সময় এই নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে আসে শিক্ষার্থীরা। অনেক সময় গোদারা থেকে পরে গিয়ে বই খাতা কাপড়-চোপড় কাদায় নষ্ট হয়ে যায়। এখানে যদি একটি সেতু হতো, তাহলে দুই উপজেলার মানুষের অনেক উপকার হতো।’
চান্দালীপাড়া গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা উসমান গনী বলেন, ‘আমরা সুনামগঞ্জ জেলার পশ্চিমাঞ্চলের শেষ প্রান্তের বাসিন্দা। সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে বেশিরভাগ প্রয়োজনে নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় আসা-যাওয়া করতে হয়। অনেক সময়ে গোদারা পার হতে গিয়ে নৌকা ডুবে মানুষও মারা গেছে। বেশ কয়েকবার এলজিইডি থেকে এসে জরিপ করে নিয়ে গেলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।’
কলমাকান্দা সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হাজী আব্দুল আলী বিশ্বাস বলেন, ‘দুই জেলার সীমান্তে সোমেশ্বরী নদীর অবস্থান। নদীটির ওপর সেতু না হওয়ায় মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে। নৌকা ডুবে দুর্ঘটনাও ঘটেছে। তাই এ নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করা খুবই প্রয়োজন।’
মধ্যনগর উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘সোমেশ্বরী নদীতে সেতু নির্মাণের জন্য মাটির গুণাগুণ ও টপো সার্ভে করা হয়েছে। ডিজাইন ইউনিটে ডিজাইন কাজ চলমান রয়েছে।’
সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সেতু নির্মাণের প্রস্তাবনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’