রাসেল আহমদ, মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৫ ১৬:০৬ পিএম
দেশীয় ও সুস্বাদু ‘রাণী মাছ’ এখন আর আগের মতো দেখা যায় না সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর ও আশপাশের জলাশয়ে। জেলেদের জালে এ মাছ এখন ধরা পড়ে খুবই কম। এক সময় আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত প্রচুর ধরা পড়লেও বর্তমানে এটি প্রায় বিলুপ্তির পথে বলে জানান স্থানীয় জেলেরা।
দেশের অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি ও দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরক ‘Ecologically Critical Area’ ঘোষণা করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির প্রকাশিত গবেষণায় টাঙ্গুয়ার হাওরে দেশি মাছের প্রজাতি কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
এতে বলা হয়, রাণী, বাচা, কাজলি, বাতাসি, লাল খলশে, চুচিয়া, ঢেলা, মলা, মহাশোল, গাংমাগুর, চিতল, রিঠার মতো দেশি মাছগুলোর কিছু একেবারেই জেলেদের জালে উঠছে না। আর কিছু মাছ জালে উঠলেও সংখ্যা খুবই কম। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের দেশি মাছ রক্ষায় সরকারকে অবৈধ ও অতিরিক্ত মাছ শিকারের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে হাওরের অবশিষ্ট মাছের দ্রুত বিলুপ্তির আশঙ্কা রয়েছে।
‘বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি স্ট্যাটাস অব ফিশ জেনেটিক রিসোর্সেস অ্যাট টাঙ্গুয়ার হাওর ওয়েটল্যান্ড ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, আগে এ হাওর থেকে স্থানীয় জেলেরা ১৪১ প্রজাতির মাছ ধরতেন। তা কমে এখন মাত্র ৫৮-তে নেমে এসেছে।
মধ্যনগর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান জানান, কিছু কিছু হাওরে মাঝে-মধ্যে ‘রাণী মাছ’ দেখা গেলেও বাস্তবতায় এটি প্রায় বিলুপ্ত। টাঙ্গুয়ার হাওরে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের প্রভাব এবং আশপাশের বিলগুলোর পানি সম্পূর্ণ সেচে মাছ ধরা হয় বলে মাছের আবাসস্থল ধ্বংস হয়। রাণী মাছ বিলুপ্তির এটিই প্রধান কারণ। এছাড়া অবৈধভাবে মাছ ধরা, বিশেষ ফাঁদ ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত পানি তোলাও অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে যদি ‘রাণী মাছের’ পোনা উৎপাদন ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে সম্পূর্ণ বিলুপ্তির হাত থেকে এই প্রজাতিকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় জেলেরা বলছেন, মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে এই মাছের সংরক্ষণে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে তারা আশঙ্কা করছেন, আগামীতে হয়তো সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যাবে এই মাছ।
রাণী মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Botia dario, যা ‘বাঙালি লোচ’ নামেও পরিচিত। এটি দেখতে রঙিন, মিঠাপানির মাছ। এই মাছ সাধারণত দুই–তিন মাসে একবার প্রজনন করে। পূর্ণবয়স্ক মাছের গড় ওজন ৮–১০ গ্রাম এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ ও জেলেরা বলছেন, এখনই পদক্ষেপ না নিলে রাণী মাছের বিলুপ্তি ঠেকানো কঠিন হবে। সম্ভাব্য করণীয় হলো, নির্দিষ্ট প্রজনন মৌসুমে অভয়াশ্রম ঘোষণা ও বাস্তবায়ন। অবৈধ ফাঁদ ও নিষিদ্ধ জাল বন্ধে নিয়মিত অভিযান। স্থানীয় জেলেদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রজনন মৌসুমে সংরক্ষণের সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রজাতিভিত্তিক গবেষণা ও গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি করা।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, রাণী মাছ শুধু একটি প্রজাতি নয়, এটি হাওরের জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় অর্থনীতির অংশ। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী প্রজন্ম এই মাছের নাম শুধু বইয়ে পড়বে। হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জেলেদের জীবনমান রক্ষায় এ মাছের সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি। বিলুপ্তির মুখ থেকে দেশীয় এই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে দরকার সরকারি উদ্যোগ ও স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।