× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে নদীগুলো

মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ২৩:৫৯ পিএম

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার শোলগাতি এলাকার মৃতপ্রায় হরি নদী। বুধবার তোলা। প্রবা ফটো

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার শোলগাতি এলাকার মৃতপ্রায় হরি নদী। বুধবার তোলা। প্রবা ফটো

এক দশকে প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও নদী রক্ষা কমিশনের বহু বৈঠক, পরিকল্পনা আর প্রকল্প সবই ছিল নদী বাঁচানোর নামে। কিন্তু মাঠে গিয়ে দেখা যায়, নদী নেই কেবল নামটুকু টিকে আছে মানচিত্রে। শুকিয়ে গেছে প্রবাহ, দখল হয়েছে তীর, বর্জ্য-দূষণে দম বন্ধ নদীর।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সর্বশেষ গত বছরের শেষ প্রান্তিক জরিপে দেখা গেছে, খুলনা বিভাগের ১৩৮টি নদীর মধ্যে অন্তত ৩৭টি অস্তিত্ব সংকটে আর ২০টিরও বেশি নদীর প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। একসময় এই নদীগুলোয় চলত পালতোলা নৌকা, ভরপুর থাকত মাছ, থই থই করত পানি। এখন সেসব নদী ভরাট করে দখল করা হয়েছে। কোথাও দখলদাররা ঘের তৈরি করেছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং জলপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র যৌথভাবে খুলনা বিভাগের আটটি জেলায় এ জরিপ পরিচালনা করেছে। এতে দেখা যায়, নদীগুলোর প্রায় ৭৮ শতাংশেই বর্ষাকালের বাইরে পানি থাকে না। আর বহু নদী এখন খাল কিংবা বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য সংকটাপন্ন নদীগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ শোলমারী, চুনকুড়ি, রূপসা, ভদ্রা, ময়ূর, পশুর, মুক্তেশ্বরী, হরিহর, ইছামতী, গড়াই, কালিগঙ্গা, কপোতাক্ষ, মধুমতী, নবগঙ্গা, চিত্রা, বেতনা, আটারোবাঁকি, খোলপেটুয়া, শিবসা ও লাবণ্যবতী।

নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অবৈধ দখল ও স্থাপনা নির্মাণ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনেক প্রকল্পই নদীর স্বাভাবিক জলচক্রে বাধা সৃষ্টি করেছে। বছরের পর বছর নদীগুলোর তলদেশে পলি জমা, খরার প্রকোপে বর্ষায়ও অনেক নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। এ ছাড়া শিল্প ও নগর বর্জ্যে নদীর বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়েছে। কৃষি ও শিল্পের জন্য নদী থেকে নির্বিচারে পানি তোলায় জলের প্রবাহ কমাটাও অন্যতম কারণ।

খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর ও মাগুরা অঞ্চলে সেচ সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, খরিপ ও রবি মৌসুমে ফসল উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। পানি না থাকায় অনেক কৃষক বিকল্প পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছেন।

নদীনির্ভর মাছ যেমনÑ পুঁটি, ট্যাংরা, চিংড়ি, শোল ও পাবদা এখন বিলুপ্তপ্রায়। মাছের প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে মৎস্যজীবী পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।

খুলনা অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী নৌপথের ৪৮টির মধ্যে এখন সচল মাত্র ১১টি। একসময় যে পথে বড় বড় নৌযান চলাচল করত, সেসব নদী আজ নাব্যতা হারিয়ে প্রায় মৃত।

অন্যদিকে, নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে সমস্যা তৈরি হয়েছে। নগর ও গ্রামীণ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে, যা স্থানীয় জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

জেলাওয়ারি নদী সংকট

খুলনা জেলা : ভদ্রা, রূপসা, শিবসা ও ময়ূর নদীর অর্ধেক প্রবাহ হারিয়েছে। খুলনা শহরের ময়ূর নদীর প্রায় ৪০% অংশ দখল হয়ে গেছে (বাপা সূত্রে)।

সাতক্ষীরা : চুনকুড়ি, খোলপেটুয়া, ইছামতী নদীতে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পানি থাকে না। মাছ ধরা বন্ধ হওয়ায় অন্তত ৩, ৫০০ পরিবার পেশা বদল করেছে।

যশোর-ঝিনাইদহ : ভৈরব, চিত্রা, নবগঙ্গা নদীর নাব্যতা কমেছে ৬০%। বড় নৌযান চলাচল বন্ধ। 

বাগেরহাট : পশুর নদীতে গত ১০ বছরে লবণাক্ততা বেড়েছে ৩৫%। মারাদি ও তালেশ্বর নদী প্রায় বিলুপ্ত।

কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গা : গড়াই, মাথাভাঙ্গা, কুমার নদীর প্রবাহ শুকনো মৌসুমে ২০%-এর নিচে। 

সুন্দরবন অঞ্চল : পশুর, বলেশ্বর ও শিবসা নদীতে লবণাক্ততা ও দূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, নদীর দখল ও ভরাট ভয়াবহ পর্যায়ে গেছে। যদি এখনই ড্রেজিং ও আইন প্রয়োগ না বাড়ানো হয়, খুলনা বিভাগের নদীগুলো মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ও বাপা খুলনা শাখার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, নদী বাঁচাতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত ড্রেজিং ও স্লুইসগেট ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ জরুরি।

খুলনা বিভাগের নদীগুলো কেবল পানি নয় এগুলো এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ এখন তারা মৃত্যুপথযাত্রী। যদি এখনই প্রশাসন, জনগণ ও বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে উদ্যোগ না নেয়, তাহলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এক ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা